কড়ানজর
  • September 28, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

৬ দফা দাবি দিবস – বাংলাজুড়ে প্রথম সর্বাত্মক হরতাল পালিত

৬ দফা দাবি দিবস   –   বাংলাজুড়ে প্রথম সর্বাত্মক হরতাল পালিত

পায়ে গুলিবিদ্ধ নোয়াখালীর শ্রমিক আবুল হোসেন পুলিশের উদ্দেশ্যে বলে , ‘বুকে গুলি কর ’।

আবুলের মতো তেজোদ্দীপ্ত-আত্মোৎসর্গীত লাখো কৃষক-শ্রমিক-জনতার রুদ্রমূর্তি, গণবিস্ফোরণ ‘৭ জুন ১৯৬৬ সাল’ দিনটিকে ইতিহাসের পাতায় ঢুকিয়ে দেয়। দিনটি হয়ে যায় ৬ দফা দাবি দিবস। বাঙ্গালির মুক্তির সনদ ৬ দফা জনগনের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা বারবার বানচাল করে পাকিরা। ১৯৬৬-এর প্রথম তিন মাসে বঙ্গবন্ধু ৮ বার গ্রেপ্তার হন। শাসকরা বুঝে যায় ছয় দফার প্রতিটি শব্দ বাঙালির প্রাণের দাবি। আর ছয় দফা অচিরেই এক দফায় রূপ নিবে। স্বাধীনতা। তাই সর্ব শক্তি দিয়ে আন্দোলন ঠেকাতে মরিয়া পাকিরা খুন-জেল-জুলুমের নেশায় মেতে ওঠে। ৬৬ সালের এই দিনে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ ১১ জন বাঙালি শহীদ হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির লালিত স্বপ্ন ‘স্বাধীনতা’র সাঁকো নির্মাণ শুরু করেন ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের লাহোরে ১৯৬৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রæয়ারি সব বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলন ডাকা হয়। বঙ্গবন্ধু ৪ ফেব্রুয়ারি লাহোরে পৌঁছান। সম্মেলনের প্রথম দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প‚র্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব ৬ দফা পেশ করেন। ৬ দফা একটি কনফেডারেশনের ফরমুলা ।

পরদিন ( ৬ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তানের ইংরেজি পত্রিকা ‘ডন’ উর্দু পত্রিকা ‘জং’ , ঢাকার প‚র্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনেম খানের ‘পয়গাম’সহ পাকিস্তানের দুই অংশের সরকার সমর্থক পত্রিকাগুলো ব্যানারহেড করে ‘শেখ মুজিব ‘বিছিন্নতাবাদী’ নেতা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন প‚র্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ পরের দিনের সম্মেলন বর্জন করেন। বঙ্গবন্ধু সম্মেলনের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে করাচিতে সোহরাওয়ার্দীর লাখাম হাউসে ওঠেন। সোহরাওয়ার্দীকন্যা আখতার সোলায়মানও ৬ দফা প্রশ্নে শেখ মুজিবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এগার ফেব্রæয়ারি (শুক্রবার) ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কাছে ৬ দফার ব্যাখ্যা করেন।

৬ দফা প্রশ্নে কিছু লোকের বিরোধিতা থাকার পর’ও শেখ মুজিবের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে সর্বপ্রথম ১৩ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় বিবৃতি দেন চট্টগ্রামের জেলা আওয়ামী লীগ সম্পাদক এমএ আজিজ। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ২১ বিশিষ্ট আইনজীবী পত্রিকায় এক বিবৃতিতে ৬ দফাকে সময়োচিত কর্মস‚চি বলে সমর্থন করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ কার্যকরী সংসদের এক বিশেষ সভায় বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবি প্রস্তাবাকারে পেশ করেন এবং তা সর্বসম্মতিক্রমে বাঙালির মুক্তির সনদ হিসেবে গৃহীত হয়।

৬ দফার প্রচারে শেখ মুজিব প্রথম জনসভা করেন চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ’৬৬ শুক্রবার জহুর আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত লাখো জনতার সমাবেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর ৬-দফাকে সমর্থন জানানো হয়। ৬-দফার পক্ষে জনমত তৈরি করতে সারা বাংলায় গণসংযোগ শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। এ সময় তাঁকে সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকায় বারবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৬৬-এর প্রথম তিন মাসে তিনি ৮ বার গ্রেপ্তার হন। ৮ মে নারায়ণগঞ্জ পাটকল শ্রমিকদের জনসভায় বক্তৃতা করার পর তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। মুজিবের আটকের প্রতিবাদে এবং ছয় দফার সপক্ষে প্রথম প্রদেশব্যাপি হরতাল পালিত হয় ১৯৬৬ সালের ৭ জুন। দিনটি যাতে পালন করতে না পারে সেজন্য মোনেম খান সবিশেষ তৎপর ছিলেন। প‚র্বদিন রাতে বেতার ভাষণে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।  এমনকি সাম্প্রদায়িকতা, বাঙালি-অবাঙালি উস্কানি দিয়ে মোনেম খান তাঁর চিরাচরিত ভাষণ দেন। ৬ জুন ছিল প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট অধিবেশন। গভর্নর মোনেম খান প্রাদেশিক পরিষদে ভাষণ দিতে গেলে বিরোধী দলের সদস্যরা পরিষদ বর্জন করে হরতালের প্রতি প‚র্ণ সমর্থন করেন। ৭ জুন সকাল বেলা লাখো শ্রমিকের সমাবেশে তেজগাঁওয়ে যুবনেতা শেখ ফজলুল হক মনি এক জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন। সভাশেষে এক বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। হঠাৎ পুলিশ মিছিলের ওপর আক্রমণ চালায়। প্রথমে লাঠিপেটা শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষ বাঁধে । পুলিশ গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ ৩ জনের মধ্যে সিলেটের অধিবাসী বেঙ্গল বেভারেজ কোম্পানির শ্রমিক মনু মিয়া ঘটনাস্থলে নিহত হন। তাঁর লাশ নিয়ে নুরে আলম সিদ্দিকীসহ অন্যরা মিছিল বের করেন। উক্ত ঘটনায় তেজগাঁও শিল্প এলাকায় শ্রমিকরা আরও বিক্ষুব্ধ হয় এবং তেজগাঁও রেল ক্রসিংয়ে দিয়ে উত্তর দিক থেকে আসা ট্রেন মাঝখানে থামিয়ে দেয়। ট্রেনটি পুনরায় চালাবার চেষ্টা করলে লাইনচ্যুত হয়। এই সময় পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে। এর মধ্যে একটি গুলি আজাদ এনামেল ও এলুমিনিয়াম ফ্যাক্টরির ছাঁটাইকৃত শ্রমিক আবুল হোসেনের পায়ে লাগে। উত্তেজিত আবুল চেঁচিয়ে বুকে গুলি করতে বলে। পাক সেনারা গুলি করে বুক ঝাঁঝড়া করে। এখানে পুলিশের গুলিতে আরও ৫ জন আহত হয়। দুপুর নাগাদ তেজগাঁও থেকে পল্টনমুখি এক জঙ্গি মিছিল পাক মোটরস, হোটেল শাহবাগ, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন হয়ে সেগুনবাগিচার মোড়ে এলে সশস্ত্র পুলিশ বেষ্টনির সামনে পড়ে। ছাত্রনেতৃবৃন্দ কার্জন হল প্রাঙ্গণে সমবেত হওয়ার জন্য মিছিলটিকে আহ্বান জানায়। তখন এক জঙ্গি মিছিল বের হয়।

এদিন নারায়ণগঞ্জের শিল্প এলাকার জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। কলকারখানা বন্ধ রাখে, জনতা ও রেলওয়ের শ্রমিকদের ওপর হামলা চালালে পুলিশের গুলিতে ৬ জন ঘটনাস্থ’লে মারা যান। তা সত্তে¡ও শ্রমিক নেতা সাদুর নেতৃত্বে লক্ষাধিক শ্রমিক-জনতা পোস্তগোলা, ডেমরা নারায়ণগঞ্জ থেকে মিছিল নিয়ে যাত্রাবাড়ী পৌঁছলে পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়। পল্টনে জনসভা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু পুলিশ ও ইপিআর বাহিনী এলাকাটি সকাল থেকেই ঘিরে রাখে, যার জন্য জনসভা করা সম্ভব হয়নি। ছয় দফা দাবি প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্যায়ের সংগ্রামে সাফল্য ও গৌরবের ইতিহাস রচনা করে তেজগাঁও, পোস্তগোলা, নারায়ণগঞ্জ, ডেমরা, আদমজীনগর শিল্পাঞ্চলের সংগ্রামী শ্রমিকরা।

এভাবেই মুক্তির সনদ ৬ দফা বাস্তবায়নে ঝরে হাজারো প্রানের তাজা রক্ত। ৬ দফার ফসল ৭০’র নির্বাচন। বঙ্গবন্ধুর নৌকার জোয়ারে সব ভেসে যায়। মানুষ স্বপ্ন দেখে স্বাধীনতার লাল-সবুজ বাংলার ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *