কড়ানজর
  • September 26, 2021
  • Last Update September 25, 2021 7:00 pm
  • গাজীপুর

১২ নভেম্বর ’৭০ ভোলার সাইক্লোনে নিহত ৫০০০০০ বাঙালির অবিশ্বাসের কফিনে শেষ পেরেক

কড়া নজর প্রতিবেদক ঃ
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার রাতে বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, বরগুনা ও ভোলাসহ দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে বয়ে যায় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় গোর্কি। গোর্কির আঘাতে বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশের দক্ষিনাঞ্চল। ১৯৭০ সালের এই দিনটি ছিল রোজার দিন। সকাল থেকেই আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন ছিল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিসহ টানা বাতাস বইছিল। বিকেলের দিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সন্ধ্যায় বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। রাত ২টা আড়াইটার দিকে মেঘনা-তেতুঁলিয়া ও বঙ্গোপসাগরের জলচ্ছাসের পানি ১৪ ফুট উচুঁ বেড়িবাধের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গোটা ভোলা জেলা তলিয়ে যায়। এ সময় মির্জাকালু বাজারের সদর রোডে হাটুর ওপরে ( ৩/৪ ফুট) পানি ওঠে। রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মাঠ-ঘাট এমনকি গাছের সাথে ঝুলে ছিরো শত শত মানুষের মৃতদেহ। দুর্যোগের সেদিনে জলোচ্ছ্বাসে গৃহহীন হয়ে পরে লাখ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় চর কুকুড়ি-মুকুড়ির মানুষের সেখানে প্রায় সকলেই সেদিনের জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়। পরদিন ১৩ নভেম্বর ভোরে পানি যখন নামতে শুরু করে তখন প্রচন্ড বেগে জলচ্ছাসের পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে অগনিত মানুষের লাশ। বিভিন্ন গাছের মাথায় ঝুলতে দেখা গেছে মানুষ ও পশুর মৃতদেহ। চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। যেন লাশের মিছিল হয়েছিল সেদিনের জলোচ্ছ্বাসে। গোটা জেলাকে তছতছ করে মৃত্যুপূরীতে পরিনত করে দিয়েছিলো। চারিদিকে ছিল শুধু লাশ আর লাশ। উপকূলের উপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। শুধু রেখে যায় ধ্বংসযজ্ঞ। বহু মানুষ তাদের প্রিয়জনের লাশ খুজেও পায়নি। জলোচ্ছ্বাসের পর থেকে দেড়মাস পর্যন্ত স্বজন হারানোদের কান্নায় উপকুলের আকাশ পাতাল ভারী ছিল। প্রলয়ংকরী এই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মেঘনা উপকুলীয় অঞ্চল লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার গুচ্ছ গ্রাম, চর আবদুল্লাহ, আজাদনগর, কাটাবনিয়া, পোঁড়াখালি, চর জগবন্ধু, চর সামছুদ্দিন, বাতিরখাল, চর কাঁকড়া, সদর উপজেলার চর মনসা,চর রমনী মোহন এলাকাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ মারা যান। নিখোঁজ এবং আহত হয় আরও কয়েক লাখ মানুষ। লাখ লাখ গবাদিপশু ও ঘরবাড়ি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। গাছপালা ও ফসলের ক্ষতি হয় ব্যাপক। বহু চর, দ্বীপ ও গ্রাম একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের পর যত্রতত্র গড়ে ওঠে লাশের স্তুপ। চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। ১৯৭০ সালের এই দিনে মারা যায় অন্ততঃ ৫ লাখ নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর।
ইয়াহিয়া ঢাকায় এলেন ভোলায় গেলেন না ঃ
ঘূর্ণিঝড় যখন আঘাত হানে তখন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে অবস্থান করছিলেন। ঝড়ের দুইদিন পরে তিনি চীন থেকে ঢাকা আসেন। কিন্তু উপদ্রæত এলাকা পরিদর্শনে না গিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যান। ফারুক চৌধুরী সে সময়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরুণ কর্মকর্তা হিসেবে প্রেসিডেন্টের সাথে চীন সফরে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন।
তার আত্মজীবনী ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ ফারুক চৌধুরী লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান চাইলে চীন থেকে ঝড়ের পরদিন ( ১৩ই নভেম্বর) ঢাকায় আসতে পারতেন। সেজন্য বিমান প্রস্তুতও ছিল। কিন্তু সেটা না করে ইয়াহিয়া ১৪ই নভেম্বর পিকিং থেকে ঢাকায় ফিরেন। ঘূর্ণিঝড়ের বিষয়টি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যে মোটেই চিন্তিত ছিলেন না, তা তার কর্মকান্ড ফুটে উঠেছিল।
ফারুক চৌধুরীর বর্ণনায় ‘সবাই ভেবেছিল, ঢাকায় থেকে রাষ্ট্রপতি নিজেই ত্রানকার্য তদারক করবেন। তা না করে পরদিনই তিনি চলে গেলেন ইসলামাবাদে। গিয়ে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে বার্তা পাঠালেন যে সফল হয়েছে তার চীন সফর।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভোলায় আসেন ১৪ই নভেম্বর
ঝড়ের সময় ভোলায় অবস্থান করছিলেন তোফায়েল আহমেদ, যিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা। ১৯৭০ সালে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তখন তিনি নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন।
১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন নিয়ে স্মৃতিচারণ করে একটি নিবন্ধ লিখেছেন তোফায়েল আহমেদ। ‘১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড় ও ঐতিহাসিক নির্বাচনের স্মৃতিকথা’ শিরোনামের লেখায় তোফায়েল আহমেদ বলেন, অসংখ্য মানুষের মৃতদেহ দেখে তিনি দিশেহারা হয়ে যান।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৪ নভেম্বর ভোলার বিভিন্ন উপদ্রæত এলাকা পরিদর্শন ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ করেন। তরুন তুর্কী তোফায়েল আহমদের উপর উদ্ধার ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব অর্পন করে ঢাকায় আসেন। হোটেল শাহবাগে এসে বিদেশী সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ভোলার সাইক্লোন নিয়ে পাকিস্তান সরকার যে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে,সেটি তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘দুর্গত এলাকা আমি সফর করে এসেছি। …. পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এখনো দুর্গত এলাকায় আসেননি।’ বঙ্গবন্ধু বাঙালির প্রতি পাকিস্তানের সর্বক্ষেত্রে অবহেলা , বিমাতাসূলভ আচরণ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নিয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, আমরা যে কত অসহায় এই একটা সাইক্লোন প্রমাণ করেছে।
১৪ দিন পর ভোলায় ইয়াহিয়া
ঘূর্ণিঝড়টি বঙ্গোপসাগরে ৮ই নভেম্বর সৃষ্ট হয় এবং ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে এটি উত্তর দিকে অগ্রসরর হতে থাকে। ১১ই নভেম্বর এটির গতিবেগ সর্বোচ্চ ঘন্টায় ১৮৫ কিমি (১১৫ মাইল) এ পৌঁছায় এবং সে রাতেই তা উপকূলে আঘাত করে। জলোচ্ছাসের কারনে পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল ও দ্বীপসমূহ প্লাবিত হয়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা ছিল তমিজুদ্দিন উপজেলা, সেখানে ১৬৭০০০ জন অধিবাসীর মধ্যে ৭৭০০০ জনই (৪৬%) প্রাণ হারায়। জাতিসংঘের আওতাধীন বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা ২০১৭ সালের ১৮মে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়গুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করে। তাতে ভোলায় আঘাত হানা সাইক্লোনটিকেই ‘সবচেয়ে শক্তিশালী সাইক্লোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। ১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর সবোর্চ্চ ২২৪ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানা এই প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের সময় উপকূলীয় এলাকায় ১০-৩৩ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ¡াস হয়েছিল।
সাইক্লোনের আগে-পরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের উদাসীনতা প্রমাণ করেছিল যে পূর্ব পাকিস্তানের জীবন-মৃত্যু পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠির কাছে খুব একটা গুরুত্ব পায় না। ঘূর্ণিঝড়ের ১৪ দিন পরে অর্থাৎ ২৬শে নভেম্বর সি প্লেনে করে ভোলায় আসলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট। দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, ত্রাণ তৎপরতায় তিনি সন্তুষ্ট। অথচ তখন ত্রাণের জন্য মানুষ হাহাকার করছে। একজন বিদেশী সাংবাদিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে প্রশ্ন করেন, ত্রাণের হাহাকার নিয়ে মানুষ সমালোচনা করছে কেন?
এ প্রশ্নের জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘মানুষ সমালোচনা করলে আমার কিছু করার নেই। আমার লক্ষ্য হচ্ছে কাজ করা এবং সমালোচনা ভুলে যাওয়া।’ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে সমর্থন করে মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট দৃশ্যত বিমর্ষ ছিলেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্য তিনি হেলিকপ্টারে করে এলাকা পরিদর্শন করেন। জেনারেল রাজা বলেন, ‘নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে হেলিকপ্টারটি ১০ হাজার ফুট উপর দিয়ে উড়ছিল। সেই উচ্চতা থেকে প্রেসিডেন্ট ধ্বংসযজ্ঞের আসল চিত্র দেখেননি। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের বেসামরিক প্রশাসন প্রেসিডেন্টকে ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে যা ধারণা দিয়েছিলেন, তাকে সেটাই গ্রহণ করতে হয়েছিল।
‘তারা প্রেসিডেন্টকে ধারণা দিয়েছিল যে খুব একটা ক্ষতি হয়নি।’ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা একটি হেলিকপ্টারে করে ভোলা গিয়েছিলেন। রাজা ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১৪ সামরিক ডিভিশনের জিওসি।
তার লেখা বই ‘অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি’ বইতে ওই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এই সামরিক কর্মকর্তা। তিনি লিখেছেন, ভোলায় যাওয়ার পরে খাদ্য এবং বস্ত্রের জন্য মানুষ তাদের ঘিরে ধরে।
খাদিম হোসেন রাজা অভিযোগ করেন যে উপদ্রæত এলাকায় অবিলম্বে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ত্রাণ তৎপরতা শুরু করার জন্য তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণরকে পরামর্শ দিলেও গভর্ণর সেনাবাহিনীকে অন্তর্ভূক্ত করতে চাননি।
বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং বর্তমানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হায়দার আকবর খান রনো তাঁর আত্মজীবনীমূলক ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে সে সময়ের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ঘূর্ণিঝড়ের সময় মওলানা ভাসানী ঢাকার একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি উপদ্রæত এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে ফিরে এসে ঢাকার পল্টন ময়দানে একটি সমাবেশ করেন তিনি। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কোন মন্ত্রী যে দুর্গত মানুষদের দেখতে আসেননি সে বিষয়টি জনসভায় জোর দিয়ে উল্লেখ করেন মওলানা ভাসানী। ‘পরদিন দৈনিক পাকিস্তানে এক চমৎকার ছবি ছাপা হয়েছিল। এক পাশে বক্তৃতারত ভাসানী। অপর পাশে পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার ৫ জন বাঙালি মন্ত্রীর ছবি। নিচে ক্যাপশন ছিল – ‘ওরা কেউ আসেনি’ – লিখেছেন হায়দার আকবর খান রনো।
বিদেশি সাংবাদিকদের চোখে ভোলা সাইক্লোন
ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানার কয়েকদিন পরে ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানের সাংবাদিক হাওয়ার্ড হোয়াইটেন ভোলায় গিয়েছিলেন। তখন তিনি ভোলার মনপুরায় বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখেন। তার পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ১৮ই নভেম্বর গার্ডিয়ান একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যাতে হাওয়ার্ড হোয়াাইটেন লেখেন, ভোলার মনপুরায় গিয়ে তিনি মৃতদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে গার্ডিয়ান লিখেছিল, ঘূর্ণিঝড় যখন আঘাত হানে তখন ছিল মধ্যরাত। রেডিওতে ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল। সেজন্য সবাই রাতে জেগেই ছিলেন। কিন্তু জলোচ্ছ্বাসের কোন পূর্বাভাস দেয়া হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা সম্পর্কে পাকিস্তান সরকার কোন ধারণা করতে পারেনি। ফলে ১২ই নভেম্বর বিকেল পর্যন্ত রেডিওতে কোন সতর্কবাণী প্রচার করা হয়নি এবং মানুষজন নিরাপদ সরিয়ে নেবার কোন উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।
দ্যা গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মনপুরা এলাকার ২২ হাজার মানুষের মধ্যে ১৬ হাজার মানুষই মারা গিয়েছিলেন। এলাকার ২০ হাজার গবাদিপশুর মধ্যে মাত্র কয়েক শ’ টিকে ছিল। সাংবাদিক হাওয়ার্ড হ্য়োাইটেনকে স্থাণীয় এক উদ্ধাকর্মী বলেন,‘আমরা এখনও পর্যন্ত ১০ হাজার মৃতদেহ মাটি দিয়েছি। আপনি দেখতে পাচ্ছেন এখনও বহু মৃতদেহ পড়ে আছে।
ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পরবর্তী সময় ছিল আরও মারাত্মক। খাবারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছিলেন। জলোচ্ছ্বাসের কারণে সেখানে খাবার উপযোগী কোন পানি ছিল না। ফলে বহু মানুষ পনিশুন্যতা এবং পানি-বাহিত রোগে মারা গেছেন। এছাড়া ছড়িয়ে পড়ে রোগব্যাধি।
পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী ভোটে
এই অঞ্চলের ইতিহাসে ভোলা ঘূর্ণিঝড় ছিল অন্যতম মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগই ছিল না – এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী একটি রাজনৈতিক প্রভাবও পড়েছিল কিছুদিনের মধ্যে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সমাবেশে ভোলার সাইক্লোন নিয়ে পাকিস্তান সরকার যে নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে, সেটি তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ এক সাইক্লোন আছড়ে পড়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভোলায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, মানুষ তখনই অনুভব করেছিল যে শাসনক্ষমতা যদি পূর্ব পাকিস্তানের হাতে থাকতো তাহলে ত্রাণের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন হতো না। তখন পূর্ব পাকিস্তানের রিলিফ কমিশনার ছিলেন আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার নেই এবং দুর্গত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী যথাযথ পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার পর থেকে পাকিস্তান সরকার দৃশ্যত উদাসীন ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করার জন্য প্রথম দিন কার্যত কিছুই করেনি পাকিস্তান সরকার। খোদ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান উপদ্রুত এলাকায় যেতেই চাননি।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ভোলার সেই সাইক্লোনটি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি বাঙালির অবিশ্বাসের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছিল। তখন নির্বাচনের বাকি মাত্র ২৫ দিন বাকি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর ওই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *