কড়ানজর
  • July 26, 2021
  • Last Update July 25, 2021 9:04 pm
  • গাজীপুর

হেফাজতে ভাঙ্গণ চূড়ান্ত-রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের খেসারত

কড়া নজর প্রতিবেদন ঃ

ধর্মীয় দাবি-দাওয়া আদায়ে অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসাবে শাহ আহমদ শফী’র নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের জন্ম। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর মাদ্রাসায় তুমুল হট্টগোলের মধ্যে শফী মহাপরিচালকের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। তার ছেলে মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক আনাস মাদানিকেও বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনায় চরম অপমানিত আহমদ শফী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ সেপ্টেম্বর আহমদ শফী মারা যান। ১৫ নভেম্বর শফীর অনুসারীদের বিরোধিতার মধ্যেই হেফাজতে ইসলামের সম্মেলন হয়, তাতে আমির পদে আসেন জুনাইদ বাবুনগরী। জিম্মি করে তাঁকে সংগঠন ও হাটহাজারি মাদ্রাসা থেকে পদত্যাগে সেখানে শাহ আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানী বা তাঁর অনুসারী কাউকে রাখা হয়নি। এসময় শুধু নেতৃত্বে নয় , আমূল পরিবর্তন আসে আদর্শের ক্ষেত্রেও। অরাজনৈতিক লেবাস খুলে রাষ্ট্রের মসনদ দখলের খেলায় নামে। সরকারবিরোধী কয়েকটি দলের উসকানি ও মদদে মামুনুল হকের মত কিছু চরম উগ্রপন্থি নেতার রাতারাতি উত্থান ঘটে। অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা-উম্মাদনা ছড়িয়ে, চটকদার বক্তব্য দিয়ে, ধর্মীয় জোশ তৈরি করে ব্যাপক সহিংসতা, ভাংচুর ,আগুন দিয়ে সরকার উৎখাতের স্বপ্ন দেখে।

অতি বিপ্লবী থেকে পা হড়কে খাদে ঃ

৩ এপ্রিল মামুনুল হকের রিসোর্ট-কেলেঙ্কারি এবং ভাংচুর-সহিংসতার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার শুরু হলে গভীর সংকটের মুখে পড়ে হেফাজত। সেই থেকে পিছু হটা শুরু হেফাজতের। পিঠ বাঁচাতে রোববার রাত ১১টায় এক ভিডিও বার্তায় আমির জুনায়েদ বাবুনগরী কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। অবশ্য কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণার সাড়ে ৪ ঘণ্টা পরই সংগঠনটি একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে। আহ্বায়ক কমিটির প্রধান হন বিলুপ্ত কমিটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। রাত সাড়ে তিনটার দিকে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের নেতা নুরুল ইসলাম জিহাদি আহ্বায়ক কমিটির ঘোষণা দেন। এরপর সকালে একটি সংবাদ বিবৃতির মাধ্যমে জানানো হয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সংখ্যা তিনজন। বাবু নগরী আহবায়ক, প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবু নগরী, সদস্য সচিব নূরুল ইসলাম জিহাদি।

বাবুনগরী আমির হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি হেফাজতকে বিতর্কিত করেছেন, একটি রাজনৈতিক আবরণ দিয়েছেন। বাবুনগরী ও মামুনুল হক বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এখান থেকেই এখন হেফাজতের ভাঙ্গনের সূচনা হয়েছে।

হেফাজতের ভাঙ্গন চূড়ান্ত ঃ

আল্লামা শফীপুত্র আনাস মাদানীর অনুসারীরা নব গঠিত আহ্বায়ক কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আল্লামা শফীপুত্র’র নেতৃত্বে নতুন কমিটি আসছে ঈদের পরেই। মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা কারণ দেখিয়ে হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমিরের পদ ছাড়লেন মাওলানা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান। আরও অনেকেই পদ ছাড়ার জন্য পাইপ লাইনে। হেফাজতের বর্তমান নেতৃত্বের অনেকেই আনাস মাদানীর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সরকারের একটি বিশেষ অংশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে আনাস মাদানীর। পবিত্র রমজান মাসের পরেই হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। পরিস্থিতি টের পেয়ে বাবুনগরী ও মামুনুল হকের নেতৃত্বের সঙ্গীরা সটকে পড়ছেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েন দেখা দেয় বাবুনগরী ও মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলামের। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিববর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতার মাধ্যমে হেফাজতে ইসলাম সরকারের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এরপর হেফাজতের হরতাল আহ্বান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারী, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালিয়ে পুলিশের থানা, ক্যাম্প, আক্রমণ, আগুন দিয়ে জ¦ালাও পোড়াও, ভাংচুর করে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে হেফাজতে ইসলাম। এসব ঘটনায় ১৭ জন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনার মধ্যেই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও রয়েল রিসোর্টে কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা ঝর্ণাকে ধরা পড়েন মামুনুল হক। শুধু তাই নয়, জান্নাত আরা ঝর্ণাকে নিয়ে ধরা পড়ার পর জান্নাত ফেরদৌস লিপি নামে আরেক নারীর সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হয়। এই নারী মামুনুল হকের তৃতীয় স্ত্রী বলে দাবি করা হয়। এসব ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের ভাবমূর্তি তো বিনষ্ট হয়েছেই, এমনকি ধর্মপ্রাণ ইসলামী চিন্তাবিদ, আলেম, ওলেমা মাশায়েখদেরও আর মুখ দেখানোর উপায় নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিতে হেফাজতের ইসলাম নামক সংগঠনটির ভাঙ্গনের সানাই বেজে উঠেছে।

নায়েবে আমিরের পদত্যাগ ঃ

মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারিসহ হেফাজতের নেতৃত্বের বিতর্ক নিয়ে হেফাজত ইসলামের নায়েবে আমিরের পদ ছাড়লেন মাওলানা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফরায়েজী আন্দোলন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, আমি নিজের অনুভূতি ও উপলব্ধি থেকে বলছি, হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ইন্তেকালের পর হেফাজতে ইসলামে যোগ্য নেতৃত্বের সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহসভাপতি আব্দুল বাতেন, মবিন উদ্দিন আহম্মদ, নওশী মিয়া, আব্দুল বাতেন নোমান, আবুল কাশেম চাকলাদার, মহাসচিব আঃ রহমান খান ফরায়েজী, যুগ্ম-সম্পাদক নুরুল ইসলামসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। হেফাজতে ইসলামের মধ্যে দলাদলি সৃষ্টি হয়েছে, নিজেদের মধ্যে। বিভিন্ন দল ও ভিন্ন মতাদর্শের মানুষ অনুপ্রবেশ করেছে এবং তারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে হেফাজতে ইসলামকে অত্যন্ত সুকৌশলে মাঠে নামানোর চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে হেফাজতে ইসলামকে তারা অনেকটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়েছে। নানা ঘটনায় বিতর্কের মধ্যে থাকা ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নায়েবে আমিরের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিলেন বাংলাদেশ ফরায়েজী আন্দোলনের সভাপতি মাওলানা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান। তিনি বলেছেন, মোদিবিরোধী বিক্ষোভের নামে দেশে যা হয়েছে, তাতে তিনি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে, এই স্বাধীনতা একটি সমষ্টিগত অর্জন। স্বাধীনতার সুবিধা এবং স্বাধীনতার আবেগ, অনুভূতি, উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার অধিকার সকল নাগরিকের রয়েছে। তাই স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে আমি বাংলাদেশের সকল জনগণকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদযাপনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে কেন্দ্র করে আগে ও পরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। এহেন পরিস্থিতিতে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর মতো মহান নেতৃত্বের শূন্যতা অনুভব করছি।

গনেশ উল্টে গেছে ঃ

গত কয়েকদিনে আল্লামা শফীর পুত্র আনাস মাদানী নেতৃত্বে হেফাজতের বর্তমান নেতৃত্বের অনেকেই বৈঠক করেছেন, তারা আলাপ-আলোচনা করছেন। ঈদের পরেইই হেফাজতের একটি নতুন অংশ আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে মজার ব্যাপার হলো যে, জুনায়েদ বাবুনগরী যখনই হেফাজতের আমির নির্বাচিত হয়েছিলেন সেই সময়ে হেফাজতের প্রধান অংশ পুরোটাই ছিল জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারী এবং জুনায়েদ বাবুনগরীর পক্ষে। সেই সময়ে আল্লামা শফীর পুত্র এত সংখ্যালঘু ছিলেন যে, তিনি আলাদা অবস্থান শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করতে পারেননি। এমনকি যখন তাকে হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, তখনও তিনি তার প্রতিবাদ করতে পারেননি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে দ্রুতই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।

হেফাজতের ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, বাবুনগরী ও মামুনুল হকের নেতৃত্বে যদি ভাস্কর্যবিরোধী এবং নরেন্দ্র মোদিবিরোধী আন্দোলন না করা হতো তাহলে এই পরিস্থিতি হতো না। এখন হেফাজতের অনেক শিক্ষক এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই মনে করছেন যে বর্তমান নেতৃত্ব যদি অব্যাহত থাকে তাহলে হেফাজতকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে এবং মাদ্রাসার যে সুযোগ-সুবিধা সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে। আর এই প্রেক্ষাপটেই হেফাজতের নতুন নেতৃত্বের মেরুকরণ হচ্ছে।

কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঃ

রোববার বিকেলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকার ঘোষণা দেওয়া হয়। আল-হাইআতুলের অধীনেই কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা হয়ে থাকে। যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসায় আল-হাইআতুলের স্থায়ী কমিটির সভায় ছাত্র-শিক্ষকদের রাজনীতির বাইরে থাকার ওই সিদ্ধান্ত হয়। তাঁদের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে গিয়ে এই সিদ্ধান্ত জানাবেন বলেও ঠিক হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *