কড়ানজর
  • March 3, 2021
  • Last Update January 31, 2021 2:56 am
  • গাজীপুর

হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার চার বছর আজ – ৭ জনকে ফাঁসির দণ্ড, উচ্চ আদালতের ‘ডেথ রেফারেন্স’র অপেক্ষা

হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার চার বছর আজ
৭ জনকে ফাঁসির দণ্ড, উচ্চ আদালতের ‘ডেথ রেফারেন্স’র অপেক্ষা

কড়া নজর প্রতিবেদনঃ

হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার চার বছর আজ। ২০১৬ সালের ১ জুলাই দেশের ইতিহাসে ভয়াবহ, নৃশংস জঙ্গি হামলার শিকার হয় বাংলাদেশ। এদিন রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় ১৯ বিদেশি নাগরিক, দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ নিহত হয় ২২ জন। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দীর্ঘ দুই বছরের তদন্তে ২১ জনের সংশ্লিষ্টতা পায় কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এর মধ্যে ১৩ জন বিভিন্ন অভিযানে নিহত হলে বাকি আটজনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় তদন্ত সংস্থা।
গত বছরের ২৭ নভেম্বর আদালত হামলায় জড়িত ৭ জনকে ফাঁসি ও একজনকে খালাস দিয়ে এ মামলার রায় ঘোষণা করে। এসময় পর্যবেক্ষণে বলা হয়, দেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ক্ষুন্ন করা, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বিনষ্ট করা ও বাংলাদেশে আইএস’র অস্তিত্ব জানান দিতেই এই হামলা চালানো হয়। সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সবারই একই অপরাধপ্রবনতা ছিলো; তাই অনুকম্পা পাওয়ার কোন সুযোগ নেই।
মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্সের উপর শুনানির অপেক্ষায় আছে।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন গাইবান্ধার জাহাঙ্গীর আলম ওরফে রাজীব গান্ধী, নওগাঁর আসলাম হোসেন ওরফে আসলামুল ইসলাম ওরফে রাশেদ, কুষ্টিয়ার আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, জয়পুরহাটের হাদীসুর রহমান ওরফে সাগর, বগুড়ার রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও রাজশাহীর শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ। খালাস দেওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানকে।
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ড. বশির উল্লাহ বলেন, দায়রা জজ আদালত ও ট্রাইবুন্যাল যেসব মামলায় মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়ে থাকেন সেই সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে। এই মামলার যাতে দ্রুত শুনানি হয় তার কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
ডিএমপি অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, সবাইকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। অধিকাংশ ধরা পড়েছে। ফলে তাদের সেই সাংগাঠনিক কাঠামো ও সক্ষমতা নেই। তারপরও আত্মতুষ্টিতে ভোগার কারণ নেই। র‌্যাবের পরিচালক (গোয়েন্দা) লে.কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের তৎপরতা অনেক বাড়িয়েছি। আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতায় জঙ্গিদের অবস্থান দুর্বল হলেও পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি বলে মনে করেন কর্মকর্তারা। নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে তাদের কার্যক্রম। বৈশ্বিক এ সমস্যা মোকাবেলায় সমন্বিত ও পরিকল্পিত কার্যক্রমের পরামর্শ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দাবি, নিয়মিত অভিযানের ফলে দূর্বল হয়ে গেছে উগ্রবাদিদের সাংগঠনিক কাঠামো। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে এখনো সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে তারা। তাই কঠোর নজরদারি রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম।
বর্বর ওই হামলার এত বছর পরও সক্রিয় উগ্রবাদীরা। করোনা সংকটের সময়ে আবারও সক্রিয় হওয়ার শঙ্কা আছে তাদের। তাই দেশীয় জঙ্গিদের বৈশ্বিক যোগাযোগ বন্ধের ওপর বিশেষ জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, এই সময় অসহায় মানুষকে জঙ্গি তৎপরতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। সশস্ত্র জঙ্গিদলে নিতে পারে। সুতরাং আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
২০১৬ সালের ১-২ জুলাই জঙ্গি হামলার ঘটনাপঞ্জি ঃ

দিনটি ছিল শুক্রবার। রমজান মাস। সন্ধ্যারাতে হঠাৎ করে খবর ছড়ায় গুলশানে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা করে বিদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েকজনকে জিম্মি করেছে।
গুলশানের একজন বাসিন্দা রাশিলা রহিম গোলাগুলির ঘটনার বর্ণনা দেন এভাবে –
‘আমাকে আমার ড্রাইভার বললেন, আপা আপনি এখন বেরুবেন না, নিচে গোলাগুলি চলছে। তারপর দেখি আমার ড্রয়িং রুমের জানালার কাঁচ ফেটে গেল। তারপর থেকে অনবরত গুলির শব্দ শুনতে পাই। আমার মেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। আমরা সবাই কান্নাকাটি করি। কারণ খুবই আতঙ্কজনক একটা পরিস্থিতি।’
জিম্মি সংকটের ঘটনায় ১লা জুলাই সন্ধ্যারাত থেকে দিবাগত সারারাত অর্থাৎ ২রা জুলাই সারা বিশ্বের গণমাধ্যমের নজর ছিল ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারির দিকে।
রাত ৯টা ৫ মিনিট ঃ গুলশান ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিদের হামলার খবর পায় পুলিশ। গুলশানের পুলিশের সহকারী কমিশনার আশরাফুল করিম জানান, খবর পাওয়ার সাথে সাথে গুলশান থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।
রাত ৯টা ২০ মিনিটে ঘটনাস্থলে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান প্রত্যক্ষদর্শীরা। ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক এসময় টুইট করেন ‘পুলিশ ইজ সারাউন্ডিং দ্য এরিয়া, গানফায়ার স্টিল অন’।
রাত সাড়ে ৯টা’র দিকে গোলাগুলিতে আহত হন বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
রাত ১০টার দিকে পুলিশ, র‌্যাব এবং আধা সামরিক বাহিনী বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের কয়েকশ’ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে অবস্থান নেয়।
গণমাধ্যম কর্মীরাও ৭৯ নং রোডের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থান নেন।
রাত সোয়া ১১টা’র দিকে হাসপাতালে মারা যান বনানী থানার ওসি মোহাম্মদ সালাউদ্দীন।
রাত চারটা পর্যন্ত অস্ত্রধারীদের সঙ্গে কোন যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
আইএসের দায় স্বীকার ঃ
রাতেই ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠী তাদের বার্তা সংস্থা বলে পরিচিত ‘আমাক’এ গুলশান হামলার দায় স্বীকার করে ২০ জন নিহত হবার কথা জানায়।
আইএস এর পক্ষ থেকে হামলাকারীদের মধ্যে পাঁচজনকে তাদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে, হামলার দায় নেয় তারা।
২রা জুলাই অভিযানের ঘটনাক্রম ঃ
সকাল ৭ টা ৩০ মিনিট ঃ রাতভর গুলশানের হোলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট সংলগ্ন এলাকা ঘিরে রাখার পর যৌথ সেনা, নৌ, পুলিশ, র‌্যাব এবং বিজিবি’র সমন্বয়ে যৌথ কমান্ডো দল গুলশানে অভিযানের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়।
৭টা ৪৫ মিনিট ঃ কমান্ডো বাহিনী অভিযান শুরু করে। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত দলের সদস্যরা রেস্টুরেন্টের ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়।
সকাল সোয়া ৮টায় রেস্টুরেন্ট থেকে প্রথম দফায় নারী ও শিশুসহ ৬ জনকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। পাশের একটি ভবন থেকে একজন বিদেশী নাগরিক তাঁর মোবাইল ফোনে সেটি ধারণ করেন।
৮টা ৫৫ মিনিটে ভবনের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভিযানকারীরা। গোয়েন্দা দল ভবনের ভেতর বিস্ফোরকের জন্য তল্লাশি শুরু করে। কিছুক্ষণ পরই আলামত সংগ্রহের কাজ শুরু করে গোয়েন্দারা।
৯টা ১৫ মিনিটে অভিযান শেষ হয়। কমান্ডো অভিযানের মধ্য দিয়ে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে প্রায় ১২ ঘণ্টার রক্তাক্ত জিম্মি সংকটের অবসান হয়।
সকাল ১০টায় ৪ জন বিদেশিসহ ১৩ জন জীবিত উদ্ধারের খবর জানানো হয়। রেস্টুরেন্টের ভেতরে অজ্ঞাত পাঁচজনের মৃতদেহ পাবার কথা পুলিশ জানায়।
১১টা ৫০ মিনিট ঃ অভিযানে জঙ্গিদের ৬ জন নিহত এবং একজন ধরা পড়েছে বলে নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে আইএসপিআর থেকে এক সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয় রেস্টুরেন্ট থেকে ২০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *