কড়ানজর
  • September 20, 2021
  • Last Update September 20, 2021 2:51 am
  • গাজীপুর

স্বীকৃতি পেতে মরিয়া তালেবান কেউ এগিয়ে আসছেনা

কড়া নজর প্রতিবেদক ঃ
চীন তালেবানের কাবুল দখলের পর খোলাখুলি তাদের উচ্ছ¡াস প্রকাশ করেছিল। তালেবান সরকার গঠনের পরদিনই তারা তালেবান সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। তালেবানকে যে দেশটির সবচেয়ে মদতপুষ্ট বলে মনে করা হয়, সেই পাকিস্তানের ভূমিকাও অস্পষ্ট নতুন কাবুল সরকার নিয়ে । কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তালেবানের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে।
কিন্তু চীন, পাকিস্তান,ইউএই বা কাতার কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি এখনও দেয়নি। তবে বৈধতা এবং আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য তালেবান উন্মুখ হয়ে পড়েছে। তারা মনে করছে, সরকার পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু দেশের, বিশেষ করে প্রতিবেশি কিছু দেশের স্বীকৃতি জরুরি
আফগানিস্তানে তালেবানের সরকার গঠনের পাঁচ দিনের মাথায় গত রোববার কাবুল সফরে যান কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি এবং এরপর তিনি আফগান প্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ হাসান আখুন্দের সাথে একটি বৈঠক করেন। কিন্তু দোহায় ফিরে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দেন যে তালেবানের সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এখনও আসেনি।
কেন স্বীকৃতি দিতে কেউ এগিয়ে আসছে না!
১৯৯৬ সালে তালেবান কাবুল দখলের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পাকিস্তান ওই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। সৌদি আরব বাকি বিশ্বের তোয়াক্কা না করে ১৯৯৬ সালে তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, এবার তারা তালেবানের কাবুল দখলের পর একটি কথাও বলেনি। কাতারের সাথে তালেবানের দহরম মহরম হয়তো সৌদিদের পছন্দ নয়। পাকিস্তানই দেন-দরবার করে তালেবানের জন্য ইউএই’র স্বীকৃতি আদায় করেছিল। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, প্রথমে স্বীকৃতি দেওয়ার ‘দায়’ কেউ নিতে চাচ্ছে না। পাকিস্তান হয়ত তাকিয়ে আছে চীনের দিকে, চীনও পাকিস্তানের দিকে। উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান চেয়ে আছে সম্ভবত রাশিয়ার দিকে। এই লুকোচুরির পেছনে কাজ করছে, তালেবানদের কার্যকলাপ। কারণ তালেবান মুখে তাদের পরিবর্তনের কথা বললেও কার্যকলাপ ৯৬ -২০০১ সালের মতই। স্বীকৃতির বাঁধা কাটিয়ে ওঠলেই তালেবান স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবে বলে তাদের কট্টর সমর্থক রাষ্ট্রগুলো বিশ^াস করে।
ইসলামাবাদ এখনও চুপ যে কারণে
তালেবানকে গত ২০ বছর ধরে পাকিস্তানই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে শক্তিধর করেছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে, যদিও পাকিস্তান তা সবসময় অস্বীকার করে। সে কারণেও আগ বাড়িয়ে এককভাবে তালেবানকে স্বীকৃতি দিতে পাকিস্তান চাইছে না বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
এ জন্য তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে ইসলামাবাদ এখনও চুপ। পাকিাস্তান তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না। তারা এবার একা কিছু করতে চায় না। অন্য আরও পাঁচ-দশ জনের সাথে মিলে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। প্রতিবেশি অন্য দেশগুলোর সাথে, বিশেষ করে চীনের সাথে সমন্বয় করে এবার এগুতে চাইছে পাকিস্তান। আফগান এবং তালেবানের প্রশ্নে কমপক্ষে আঞ্চলিক একটি ঐক্য চাইছে পাকিস্তান। এ কারণেই পাকিস্তানের উদ্যোগে চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা কাবুলে বৈঠক করেছেন। কিন্তু স্বীকৃতির প্রশ্নে কোন অগ্রগতি হয়নি।
তালেবানের পরীক্ষা হবে সন্ত্রাস নিয়ে
বৈধতা এবং স্বীকৃতি পেতে তালেবানের আসল পরীক্ষা হবে সন্ত্রাস নিয়ে তাদের অবস্থানের ওপর। কারণ শুধু আমেরিকা নয়, এই ইস্যুতে চীন, রাশিয়া এমনকি পাকিস্তানও কমবেশি উদ্বিগ্ন।
পাকিস্তান চায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি- যা পাকিস্তান তালেবান নামে পরিচিত) নেতাদের ধরে তাদের হাতে তুলে দেয়া হোক। চীন চায় শিনজিয়াংয়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠি ইটিআইএম’কে আফগানিস্তান থেকে হটাতে হবে।
অন্যদিকে, আরেক প্রতিবেশি ইরান চায় আইএস এবং আল-কায়দা যেন আফগানিস্তানে না থাকে। আর রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর চাওয়া হলো, আইএস-কে (ইসলামিক স্টেট-খোরাসান) যেন কোনওভাবেই আফগানিস্তানে প্রশ্রয় না পায়।
আটকে দেয়া অর্থ হবে প্রধান অস্ত্র
আফগানিস্তানে গত ২০ বছর ধরে আমেরিকা এবং পশ্চিমা যে সাহায্যের ওপর ভর করে ছিল, তা রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মানুষের কাছে খাবার কেনার টাকাও নেই। জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা বলছে, দ্রæত ত্রাণ এবং সাহায্য না গেলে ৯৭ শতাংশ আফগান দারিদ্র সীমার নিচে চলে যেতে পারে, যে হার এখন ৭২ শতাংশ। তালেবানের ক্ষমতা দখলের পর পশ্চিমা দেশগুলোতে, বিশেষ করে আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভে, আফগানিস্তানের প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার (১,০০০ কোটি মার্কিন ডলার) আটকা পড়েছে।
আমেরিকার খাতায় তালেবান একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠি। সুতরাং আফগান সরকারের এই টাকা আটকে রাখার আইনগত বৈধতা আমেরিকার রয়েছে। পাশাপাশি, এ মাসেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ থেকে জরুরি ঋণ হিসাবে ৪০ কোটি ডলার পাওয়ার কথা ছিল আফগানিস্তানের, যা স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে।
আটকে দেয়া এসব টাকা এখন তালেবানের ওপর প্রভাব খাটানোর জন্য আমেরিকা এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের প্রধান অস্ত্র।
স্বীকৃতি নির্ভর করবে মানবাধিকার ও নারী অধিকারের ওপর
তালেবানের জন্য একমাত্র আশার কথা আমেরিকা এবং তাদের সিংহভাগ পশ্চিমা মিত্র এখনও তালেবানের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি নাকচ করছে না। ফ্রান্স এবং ডেনমার্ক ছাড়া কোন দেশই বলেনি যে তালেবানকে কখনই তারা মেনে নেবে না।
তবে মানবাধিকার ও নারী অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইএস ও আল-কায়দার মত গোষ্ঠিগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেওয়ার শর্ত আরোপ করছে তারা। আমেরিকা বলছে যে তারা আফগানিস্তানে মানবিক সাহায্য অব্যাহত রাখবে, তবে সেই সাহায্য যাবে শুধুমাত্র জাতিসংঘ এবং এনজিও-র মাধ্যমে।
এটি ধারণা দিচ্ছে যে পশ্চিমা সরকারগুলো হয়তো তালেবানের সামনে দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না। তবে এই তহবিলের সাথে মানবাধিকার, নারী অধিকার শর্ত জুড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
বিভিন্ন আফগান জাতিগোষ্ঠি, সংখ্যালঘু এবং ভিন্নমতের লোকজনকে তালেবান তাদের সরকারে শেষ পর্যন্ত কতটা জায়গা দেবে তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তাদের শিক্ষানীতিতে নারীদের শিক্ষার অধিকার মেনে নিয়েছে তালেবান, যদিও নির্দেশ দিয়েছে যে নারী-পুরুষ একসাথে ক্লাশে বসা চলবে না।
এক মাস আগে কাবুল দখল তালেবানের জন্য যত সহজ ছিল, বৈধতা অর্জন ও দেশ শাসন করা হবে ততটাই জটিল এবং কঠিন।

#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *