কড়ানজর
  • September 26, 2021
  • Last Update September 25, 2021 7:00 pm
  • গাজীপুর

সাইকোডেলিক মাদক এলএসডি তিন শিক্ষার্থী ৫ দিনের রিমান্ডে, আরো ৫ জন গ্রেপ্তার

কড়া নজর প্রতিবেদন ঃ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইইথ্যালামাইড) মাদকের সন্ধান পায়। ইতোপূর্বে গ্রেপ্তার ৩ বিশ^বিদ্যালয় ছাত্রের আজ ৫ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। এদিকে আজ রোববার রাজধানীর খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভয়াবহ মাদক এলএসডিসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগ।
রোববার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইফতেখায়রুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাজধানীর খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ভয়ঙ্কর মাদক এলএসডি জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আজ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় পল্টন থানায় সংবাদ সম্মেলন করেন মতিঝিল বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আহাদ।
তিন শিক্ষার্থীর পাঁচ দিন করে রিমান্ড
রাজধানী থেকে এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাইথ্যালামাইড) নামক মাদক উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শিক্ষার্থীর পাঁচ দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ ও তথ্য বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুর রহমান গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রোববার পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত ভার্চ্যুয়াল শুনানি নিয়ে এই আদেশ দেন।
এলএসডি বেচাকেনায় জড়িত অভিযোগে গত বুধবার রাতে রাজধানীর ধানমন্ডি ও লালমাটিয়া থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন-সাদমান সাকিব ওরফে রূপল (২৫), অসহাব ওয়াদুদ ওরফে তূর্য (২২) ও আদিব আশরাফ (২৩)। তারা রাজধানীর দুইটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনের (বিবিএ) ছাত্র। তিনজনের বিরুদ্ধে ধানমন্ডি থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করে ডিবি।
আদালত সূত্র বলছে, এলএসডি উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিনজনকে সাত দিন রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। ভার্চ্যুয়াল শুনানি নিয়ে আদালত প্রত্যেকের পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন।


যেভাবে এলএসডি’র সন্ধান মেলল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে তারা এলএসডি মাদকের সন্ধান পায়। ডিবি সূত্র জানায়, গত ১৫ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুরকে কার্জন হল এলাকায় তার তিন বন্ধু এলএসডি সেবন করান। এর প্রতিক্রিয়া শুরু হলে তিনি সেখান বেরিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের সামনে এক ডাব বিক্রেতার ভ্যানে রাখা দা নিয়ে তিনি নিজের গলায় আঘাত করেন। পরে ঢাকা ঢামেকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর আট দিন ঢামেক মর্গে তার লাশ অজ্ঞাতনামা হিসেবে পড়ে ছিল। পরে তার ভাই লাশ শনাক্ত করেন। হাফিজুরের আত্মহত্যার বিষয়ে ডিবির রমনা বিভাগ ছায়া তদন্ত শুরু করে। হাফিজুরের কয়েকজন বন্ধুকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ও গোয়েন্দা তথ্যে এলএসডির তথ্য জানতে পারে। তাদের কাছ থেকে ২০০ ব্লট এলএসডি উদ্ধার করা হয় এবং তাদের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।
ডিবি জানায়, এলএসডি মাদক নেদারল্যান্ডস থেকে আমদানি করা হয়। অনলাইনে আর্থিক লেনদেনের আন্তর্জাতিক মাধ্যম পেপ্যালের মাধ্যমে টাকার লেনদেন হয়।


এলএসডি কী?
মাদকটি সেবনে দুই ধরণের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। একটি সেবনকারীকে সাময়িক আনন্দ দেয়। অন্যটি হ্যালুসিনেশন ও ইলোশন দুইটাই তৈরি হয়। আর হ্যালুসিনেশনটা যখন দীর্ঘায়িত হয় তখন সৃষ্টি হয় বড় সমস্যা। এমনকি ব্যক্তি পাগল পর্যন্ত হয়ে যায়। চিকিৎসকরা বলছে মাদকটি অতিমাত্রায় গ্রহণে সুইসাইড পর্যন্ত করে বসে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য বিভাগের অধীনস্থ মাদক বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ড্রাগ অ্যাবিউজের তথ্য অনুযায়ী, ডি-লাইসার্জিক অ্যাসিড ডায়েথিলামাইড বা এলএসডি রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে তৈরি একটি পদার্থ। বিভিন্ন ধরণের শস্যের গায়ে জন্মানো এক বিশেষ ধরণের ছত্রাকের শরীরের লাইসার্জিক অ্যাসিড থেকে তৈরি করা হয়।
এটি স্বচ্ছ, গন্ধহীন একটি পদার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মতে এটি পাউডার, তরল, ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলের আকারে পাওয়া যায়।
এলএসডি’কে ‘সাইকাডেলিক’ মাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই ধরণের মাদকের প্রভাবে সাধারণত মানুষ নিজের আশেপাশের বাস্তবতাকে ভিন্নভাবে অনুভব করে এবং কখনো কখনো ‘হ্যালুসিনেট’ বা অলীক বস্তু প্রত্যক্ষও করে থাকে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক (ঢাকা গোয়েন্দা) মো. শামিম আহম্মেদ, ২০১৯ সালের জুলাই মাসের ১৫ তারিখে রাজধানীর কাফরুল থানায় একটা মামলা হয়েছিল যার মামলা নং ২১। যেখানে এলএসডির ৪৬টি স্ট্রিকসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ মামলটির তদন্ত শেষে ইতিমধ্যে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়ে গেছে। এর পরে সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজুর রহমানের মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আবার সামনে আসলো এ মাদকদ্রব্যটি।গ্রেপ্তার হাফিজুরের ৩ বন্ধু হলো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুপল ও তুর্জ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্র আদিব। গ্রেপ্তার তিন তরুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে মাদক বিক্রি করতো। তারা ‘আপনের আব্বা’ ও ‘গ্রেট ব্রাইনি এন্ড বিয়ন’-এই দুটির মাধ্যমে মাদক বিক্রি করত। তারা এলএসডি ও গাঁজার নির্যাস দিয়ে তৈরি এক ধরণের ‘গাঁজার কেক’ বিক্রি করতো। এই ‘গাঁজার কেক’ নতুন উদ্ভাবন বলে দাবি তাদের। বৃহস্পতিবার (২৭ মে) ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) একেএম হাফিজ আক্তার সংবাদ সম্মেলনে করে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, এলএসডি সাধারণত অন্যান্য মাদক থেকে অনেক ক্ষতিকর একটি মাদক। এটি ব্যবহারে এক ধরণের উত্তেজনা তৈরি হয় যেটি তাকে ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়। এটি গ্রণের ফলে ব্যাক্তির চোখের সামনে অনেক কিছু ভাসবে তবে সেটির বাস্তবের কোন অস্তিত্ব নেই। যেমন সে ঘরে বসে দেখছে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে কিংবা উড়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত হ্যালুসিনেশনের কারণে এমনকি আত্মহত্যাও করতে পারে। এসব মাদক সাধারণত অল্প বয়সের ছেলে-মেয়েরা গ্রহণ করে থাকে। যেটি সামাজিক প্রেক্ষাপটে ভয়ানক।
তবে এলএসডি এমন ভয়ানক মাদক যেটি বেশি মাত্রায় গ্রহণের ফলে হিং¯্রতা বেড়ে যায়। অনেক সময় গ্রহণকারীর অতীত মনে পড়ে যায়, কখনো কখনো নিজেকে অতিমাত্রায় শক্তিশালী মনে করে। রাগান্বিত হয় ও শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং ডিপ্রেশন বেড়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *