কড়ানজর
  • September 19, 2021
  • Last Update September 19, 2021 9:03 pm
  • গাজীপুর

শীর্ষ পর্যায়ে বিরোধ শুরু তালেবান আপাদমস্তক ভণ্ড


কড়া নজর প্রতিবেদন ঃ
তালেবান নেতা মোল্লা আব্দুল গনি বারাদার দোহা থেকে কাবুল এসেছিলেন নতুন সরকার গঠন করতে। তখন তার ভাষ্য ছিল ‘আমরা এমন একটি সরকার গঠন করার চেষ্টা করছি যাতে আফগানিস্তানের সকল জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকে।’ কিন্তু অর্ন্তবর্তী সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করেন সদস্যরা বেশিরভাগই পশতু জাতিগোষ্ঠীর সদস্য। মন্ত্রিসভায় রয়েছেন একজন তাজিক এবং একজন হাজারা – তারা দু’জনেই তালেবানের সদস্য। একজন নারীকেও মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়নি। এমনকি উপমন্ত্রীর মর্যাদায়ও কোন নারী নেই। নারী আলোচনাকারীদের সাথে কথা বরার সময় তারা আশ্বস্ত করেছিলেন যে ‘একমাত্র প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়া যে কোন পদে নারীদের ভূমিকা থাকবে। এমনকি মন্ত্রী পদেও।’এই হলো তালেবানের চেহারার একাংশ।
আব্দুল গনি বারাদার আফগানিস্তান তালেবান সরকারের হাতে কোন্ ধারার শাসনের সূচনা হচ্ছে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তালেবানের নতুন সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করেন।
তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে বিরোধ শুরু
প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে তালেবানের সহ-প্রতিতিষ্ঠাতা মোল্লাহ আবদুল গনি বারাদারের সঙ্গে একজন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যের সঙ্গে বাকবিতÐা হয়েছে। আফগানিস্তানে তালেবানের বিজয়ে কৃতিত্ব কার হবে, সেই নিয়েই বিরোধের শুরু হয়েছে। জানা যাচ্ছে, বারাদার মনে করেন যে, তার মতো যারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়েছেন, কৃতিত্ব তাদের। তবে তালেবানের অন্যতম জ্যেষ্ঠ একজন নেতা পরিচালিত হাক্কানি গ্রæপের সদস্যদের মত, যুদ্ধের মাধ্যমে তারা এই বিজয় পেয়েছেন।
তালেবান নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ চলছে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই খবর পাওয়া যাচ্ছিল, যদিও তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সা¤প্রতিক দিনগুলোতে জনসমক্ষে দেখা যায়নি মোল্লাহ বারাদারকে।
প্রথম তালেবান নেতা হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হয়েছে বারাদারের। ২০২০ সালে তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার টেলিফোনে কথা হয়। তার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার চুক্তিতে তালেবানের পক্ষে তিনি স্বাক্ষর করেন।
সেই সময় আফগান বাহিনী ও তাদের পশ্চিমা মিত্রদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাক্কানি নেটওয়ার্ক সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ কিছু হামলার সঙ্গে জড়িত ছিল। এই গ্রুকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন বলে তালিকাভুক্ত করেছে। তালেবানের অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন এই দলের নেতা সিরাজুদ্দিন।
তালেবানের কথা কাজে বিস্তর ফারাক
ঝড়ের গতিতে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর গত ১৫ই অগাস্ট কাবুলে তালেবানের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তালেবানের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ্ মুজাহিদ বলেন ‘আমরা শানিÍতে বসবাস করতে চাই।’ তিনি এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন , ‘আমরা দেশের ভেতরে বা বাইরে কোন শত্রু চাই না।’ কিন্তু ক্ষমতা সংহত হওয়ার পর তারা ঘোষণা দেয় কাশ্মীরের মুসলমানদের স্বার্থ দেখবে।
বেশ কিছুদিন ধরেই তালেবান নেতারা এসব কথা বলে আসছিলেন। তাদের অন্যতম বক্তব্য ছিল ১৯৯৬-২০০১ সালের তালেবান আর বর্তমান তালেবান এক নয়। কিন্তু অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারে যে সব মুখ স্থান পেয়েছে তারা পুরনো তালেবানই। পশ্চিমা বিশ্বকে বোকা বানিয়ে তালেবান পুরনো রাস্তাই হাঁটছে।
কাবুলে পাকিস্তান-বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলকে বাঁধা দিয়েছে তালেবান যোদ্ধারা। কিন্তু যেদিন কাবুলসহ অন্যান্য শহরে আফগান নারীরা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার নিয়ে তাদের অধিকার, সরকার ও সমাজে তাদের বড় ভূমিকার দাবিতে বিক্ষোভ দেখানো শুরু করলেন, তখনই দেখা গেল তালেবানের নতুন সরকারের আসল রূপ। এটাই কি মিডিয়া সচেতন তালেবান? বিক্ষোভ ভেঙে দিতে তারা যে ফাঁকা গুলি ছুঁড়েছে, রাইফেলের বাট আর লাঠি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের পিটুনি দিয়েছে সেটা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য তারা আয়োজন করেছে এক অনাড়ম্বর সংবাদ সম্মেলনের। সোশাল মিডিয়ায় এটা নিয়ে প্রবল আগ্রহ শুরু হলেও তারা যে কথাটি বলেছে তাতে তালেবানের প্রতিশ্রæতির ওপর এখনও ভরসা করে আছেন যারা তাদের হৃদয় ভেঙে টুকরো হয়ে গেছে।
কথা নয় কাজের মাধ্যমে তালেবানের মূল্যায়ন করতে হবে: তালেবানের ওপর নজর রাখছে যেসব বিদেশি সরকার এবং বিশ্বব্যাপি আফগান বিশেষজ্ঞের দল এটা তাদের জন্য হয়ে উঠেছে নতুন মন্ত্র।
তালেবান পুরনো বোতলে নতুন মদ
তালেবান সবাইকে নিয়ে সরকার গঠনের প্রতিশ্রæতি দিলেও সেটা একেবারেই হয়নি। তালেবানের নেতৃত্বে পুরনো কাঠামো, এর নানা ধরনের কমিশন, ডেপুটি এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী আমির হেবাতুল্লাহ্ আখুনজাদা – এদের সবাইকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে মন্ত্রিসভার কাঠামোর মধ্যে, যেমনটি অন্য দেশের সরকারের রাজনৈতিক কাঠামোতেও দেখা যায়।
পুরনো তালেবান সরকারের নৈতিকতা সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়টি পুনর্বহাল করা হয়েছে। মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় বাদ দেয়া হয়েছে।
সরকারে প্রাধান্য কাদের
তালেবানের এই নতুন সরকার গঠিত হয়েছে পুরনো তালেবান নেতা এবং নতুন প্রজন্মের মুল্লাহ্ ও সামরিক অধিনায়কদের নিয়ে। ১৯৯০’র দশকে তালেবানের যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা ফিরে এসেছেন। তাদের দাড়ির দৈর্ঘ্যও বেড়েছে, রঙ এখন সাদা। সরকারে রয়েছে গুয়ানতানামো বে থেকে ফিরে আসা কিছু সদস্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের কালো তালিকাভুক্ত ক’জন সদস্য। গত ক’মাস ধরে তীব্র লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন এমন ক’জন অধিনায়ক, আর কিছু স্বঘোষিত শান্তি আলোচনাকারী, যারা নানা দেশে চক্কর দিয়ে সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে এটি তালেবানের নতুন সংস্করণ।
এদের মধ্যে কিছু নাম চোখে পড়ার মতো। কোন কোন নাম দেখলে মনে হতে পারে উসকানি। যেমন, কেয়ারটেকার মন্ত্রিসভার প্রধান মুল্লাহ্ হাসান আখুন্দ। তিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় তার নাম রয়েছে।
কঠোর ইসলামী অনুশাসন নাকি সমঝোতা?
কেয়ারটেকার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। তার ছবি খুঁজে পাওয়া বিরল। শুধু মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের একটি পোস্টারে তার চেহারা দেখা যায়-যেখানে খয়েরি চাদরে তার মুখ অর্ধেক ঢাকা। এফবিআই তার মাথার দাম ধরেছে ৫০ লক্ষ ডলার।
তিনি খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ২০২০ সালে একটি নিবন্ধ লিখে। এই নিবন্ধে তিনি শান্তির ডাক দেন। তবে এতে তিনি গোপন রাখেন হাক্কানি নেটওয়ার্ক নামটি তার পরিবারের কাছ থেকে এসেছে। আফগান বেসামরিক জনগণের ওপর কিছু নৃশংস হামলার জন্য এই গোষ্ঠিকেই দায়ি করা হয়। হাক্কানি পরিবার জোর দিয়ে বলে যে তাদের কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠি নেই, তারা এখন তালেবানের সদস্য।
নারী অধিকার সুদূর পরাহত
তালেবান শাসনে আফগান নারীদের অধিকার কতখানি সংরক্ষিত থাকবে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। তালেবানের কেয়ারটেকার সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হয়েছেন মুল্লাহ্ ইয়াকুব। তার কোন ছবি নেই। মন্ত্রিসভার তালিকায় তার ছবির জায়গায় রয়েছে ফাঁকা ঘর। তিনি তালেবানের প্রতিষ্ঠাতা আমির মুল্লাহ্ ওমরের বড় ছেলে।
কাবুলের সংবাদ সম্মেলনে যখন সাংবাদিকরা ঝাঁকে ঝাঁকে প্রশ্ন ছুঁড়তে শুরু করেন, তখন জানানো হয় যে আগামীতে মন্ত্রিসভার আরও নাম ঘোষণা করা হবে।
এটা হতে পারে তালেবানের নেতা ও যোদ্ধাদের পুরষ্কার দেয়ার প্রাথমিক ধাপ। এদের মধ্যে অনেকেই
দল বেধে কাবুলে এসে হাজির হচ্ছেন একটি ‘সহি ইসলামী ব্যবস্থা’র প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানোর জন্য।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তালেবানের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তির পর তালেবানের পক্ষের আলোচনাকারী নতুন সরকারের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী শের মোহাম্মদ আব্বাস স্টানিকজাই বলেছিলেন এমন এক সরকার গঠন করবো যা সংখ্যাগরিষ্ঠ আফগানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। আফগানিস্থানে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন’ হবে।
স্ট্যানিকজাইয়ের বক্তব্য, সরকার গঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের ভিত্তিতে, তারা যাকে পশ্চিমা ধারণা বলে উপহাস করে তার ভিত্তিতে নয়।
সেটা ছিল এমন এক সময় যখন আফগানরা তালেবানরা প্রচার করতেন যে তারা আফগানিস্তানে ইসলামী আমিরাত প্রতিষ্ঠা করবেন না। কারণ, তারা বলেছিলেন, এই বিষয়টি নিয়ে স্পর্শকাতরতা রয়েছে সেটা তারা উপলব্ধি করেন।
সাবেক এমপি ফওজিয়া কুফি বলেন বলেছিলেন, যিনি এধরনের এ ধরণের প্রতিশ্রæতি তারা অতীতে বহুবার শুনেছেন। কিন্তু আফগানিস্তানের সামাজিক বুনন সম্পর্কে যারা জানেন না তারা তালেবানদের এসব প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রাখেন না।
কেয়ারটেকার কেবিনেট ঘোষণা পর পরই এক বিবৃতি জারি করা হয়েছে যেখানে নতুন আমির বলেছেন, ‘মেধা, নির্দেশনা এবং কাজের জন্য সকল মেধাবী ও পেশাদার লোকের প্রয়োজন রয়েছে।’
কিন্তু এটা পরিষ্কার যে তার বক্তব্যের মূল বিষয় হচ্ছে ‘সিস্টেম’কে জোরদার করা, অর্থাৎ ইসলামী আমিরাত পূনঃপ্রতিষ্ঠা করা। বাদবাকি সবকিছুর চেয়ে এটার দাবি অগ্রগণ্য।
সন্ত্রাসবাদীদের অভয়ারণ্য, মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ এবং গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কট – তালেবানের নতুন সরকারের সাথে যারা কাজ করার চেষ্টা করছেন তাদের মাথায় এসব দুর্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন সরকার চেষ্টা করছে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে। কিন্তু সামনের এক ভিন্ন ধরনের ভবিষ্যতের চেয়েও তারা এখনও ডুবে রয়েছে অতীতে। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে মন্ত্রটা ঠিকই বজায় থাকবে – কথা নয় কাজে জানা যাবে তাদের পরিচয়।

#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *