কড়ানজর
  • September 28, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

রাণী বিলাসমণি উচ্চ বিদ্যালয়ে সক্রিয় ‘ কিশোর গ্যাং’

রাণী বিলাসমণি উচ্চ বিদ্যালয়ে সক্রিয় ‘ কিশোর গ্যাং’

ধারালো অস্ত্র-হকিস্টিক কেনার মেসেঞ্জার বার্তা
কড়া নজর প্রতিবেদন ঃ
গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়েও ‘কিশোর গ্যাং’ সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছে। বিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী একাধিক ফেসবুক মেসেঞ্জার গ্রæপ করে ভয়ংকর তৎপরতা চালাচ্ছে। মেসেঞ্জার গ্রæপে ছাত্ররা বিভিন্ন আকার-আকৃতির হকিস্টিক ও ধারালো অস্ত্র কেনার আগ্রহ ও দর নিয়ে বার্তা আদান-প্রদান করে। গ্রæপ সদস্যরা শহরের জনৈক ‘বড় ভাইয়া’র সঙ্গে দেখা করার স্থান ও সময় নিয়ে পরস্পরকে সংগঠিত করে।


এ ছাড়া বিদ্যালয়ের কোমলমতি ছাত্ররা নিজেদের ফেসবুক আইডি ও ইন্ট্রোতে নিজেদের ‘মাফিয়া ডন’ ‘ব্যাড বয়’ ‘ছোটা ডন’ ‘তোর বাপ’ ‘খারাপ ছেলে’ ‘আমারে হ্যান্ডেল করার মত কেউ জন্মায় নাই’ ‘ইবলিশ শয়তান’ ‘লিপস্টিক রিমোভার’ ‘তাকে বলে দিও আমারটাও এখন অনেক বড় আর শক্তিশালী’-এ জাতীয় অসংখ্য হলিউড-বলিউডের সিনেমার নেতিবাচক চরিত্র ও ছাপার অযোগ্য ভাষা ব্যবহার করে নিজেদের উপস্থাপন করেছে।


অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এসব ছেলেদের অনেকেরই ‘বন্ধু তালিকায়’ আছেন বিদ্যালয়েরই একজন শিক্ষক। কয়েক বছর আগে বিতর্কিত ওই শিক্ষকের বাসার গৃহপরিচারিকার মৃত্যু নিয়ে তোলপাড় হয়। কালীগঞ্জের একটি সরকারি বিদ্যালয় থেকে বছর খানেক আগে তিনি রাণী বিলাসমণি বিদ্যালয়ে পুনরায় বদলি হয়ে আসেন।


সম্প্রতি বিদ্যালয়টির শিক্ষাব্যবস্থায় ধস নামার প্রেক্ষিত খুঁজতে গিয়ে পাঠদানের দৈন্য দশা, শিক্ষকদের মান-আন্তরিকতা-কোচিং প্রবণতা-দলাদলির পাশাপাশি ছাত্রদের ‘গ্যাং কালচারে’ যুক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যার কুফল ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। নবম শ্রেণীর অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষার প্রভাতি শাখায় সাধারন গণিত বিষয়ে ১৬৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩৬ জনই অকৃতকার্য হয়েছে। এতে অভিভাবক ,সুশীল সমাজ, বিদ্যালয়ের প্রাক্তণ ছাত্রসহ সকল মহল উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
কতিপয় শিক্ষকের কান্ডজ্ঞানহীনতার পাশাপাশি ছাত্রদের অতিমাত্রায় ইন্টারনেটে আসক্তি, ‘র‌্যাগ ডে’ কালচার , নৈতিক অবক্ষয়, ‘ হিরোইজম’ ‘রোমান্টিসিজম’, সিনিয়র-জুনিয়র দ্ব›দ্ব, সন্তানদের পড়ালেখা ও গতিবিধির উপর অভিভাবকের নজর না রাখা, খেলাধুলা-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড কমে যাওয়া , সহশিক্ষা না থাকা – এসব কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


এই বিদ্যালয়ের উপরের ক্লাসের ছাত্রদের পরিচালিত ৩/৪ টি সক্রিয় মেসেঞ্জার গ্রপের সন্ধান পাওয়া গেছে। এদের পারস্পরিক আলাপচারিতার বিষয়বস্তু জ্ঞাত হলে যে কেউ আঁতকে উঠবেন।
একটি গ্রপের আলাপচারিতা এরকম ঃ

  • সাইমন (ছদ্মনাম) তো হকি (হকিস্টিক) কিনার লাইগা পাগল।
  • ছোট-বড় ২ টা চাস তাইলে ১৪০০ টাকা।
  • বড়টার সাইজ কতো ?
  • ১৫ ইঞ্চি ২৫০ টাকা কইরা।

আরেকটি কথোপকথন ঃ

  • একটা চাইনিজ কত টাকা নিবো।
  • বড় ডা ৭০০/৮৫০ টাকা । ছোটগুলা ২৫০/৩০০.
  • চাইনিজ এত কম দাম।
  • চাইনিজ নিবো ৬০০/৬৫০.
  • KAWA KI (চাইনিজ কুড়াল তৈরির ব্রান্ড )

কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি আলোচনায় আসে গত বছরের ৬ জানুয়ারি উত্তরায় ডিসকো গ্রপ ও নাইন স্টার গ্রপের দ্বন্ধে ট্রাস্ট স্কুল এন্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদনান কবির প্রকাশ্যে খুন হওয়ার ঘটনার পর। এর পর দেশের বিভিন্ন স্থানে কিশোরদের হাতে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ বরগুনায় স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে রিফাত শরীফকে নয়ন বন্ডের ‘০০৭ গ্রপ’ খুন করার পর দেশ-বিদেশে আলোচনার ঝড় তুলে।


রাণী বিলাসমণি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে জুনিয়র-সিনিয়র দ্ব›েদ্ব ছোট-বড় বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন, বর্তমানে ছাত্রদের উপর শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। দিনের পর দিন শিক্ষার্থীরা ক্লাসে অনুপস্থিত থাকলেও অভিভাবকদের অবহিত করা হয় না। অথচ ২-৩ বছর আগেও ছাত্রদের ক্লাসে উপস্থিতির ব্যাপারে বিদ্যালয় কর্র্র্তৃপক্ষ ছিলেন কঠোর। অভিভাবকদের নিয়মিত ‘ক্ষুদে বার্তা’ পাঠানো হতো। বেশ কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি শূণ্য রয়েছে। লবিংয়ের জোরে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজনকে চলতি দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করা হচ্ছে। উনার (চলতি দায়িত্বের প্রধান শিক্ষক) শিক্ষক কিংবা ছাত্র – কারো উপরই নিয়ন্ত্রণ নেই।


এ সব ব্যাপারে জানতে চাইলে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মোঃ শফিউল্লাহ বলেন , রাণী বিলাস মনি উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘গ্যাং কালচার’ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তথ্য পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন। তিনি আরও বলেন, প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি আমাদের এখতিয়ারের বাইরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *