কড়ানজর
  • September 28, 2021
  • Last Update September 28, 2021 1:03 pm
  • গাজীপুর

যুদ্ধাপরাধী সৈয়দ কায়সারের ফাঁসির দণ্ড বহাল

কড়া নজর প্রতিবেদন :

জাতীয় পার্টির সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারকে ফাঁসি কাষ্ঠে যেতেই হচ্ছে। একাত্তরের মুসলিম লীগ নেতা কায়সার ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর একজন বিশ্বস্থ সহযোগী। ‘কায়সার বাহিনী’ নামে দল গড়ে তিনি যে সব যুদ্ধাপরাধ ঘটিয়েছেন, সেজন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জের মানুষ তাকে একজন কুখ্যাত ব্যক্তি হিসাবেই চেনে।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার বিচারকের আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার মাত্র এক মিনিটে এই রায়ের সংক্ষিপ্ত সার জানিয়ে দেয়। এই বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হলেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি জিনাত আরা এবং বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান।  

২০১৪ সলের ২৩ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল তার রায়ে বলেছিল, কায়সার এতোটাই নগ্নভাবে পাক হানাদার বাহিনীর পক্ষ নিয়েছিলেন যে নিজের গ্রামের নারীদের ভোগের জন্য পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিতেও কুণ্ঠিত হননি।

২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর আপিলে আসা এটি নবম মামলা, যার চূড়ান্ত রায় হলো।

কায়সার স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের আমলে বিএনপি, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সময় জাতীয় পার্টি করে। এরশাদ সরকার তাকে প্রতিমন্ত্রী করে।

সাতটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কায়সারকে মৃত্যুদ দেয়, যার মধ্যে দুই নারীকে ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। এই দুই বীরাঙ্গনার মধ্যে একজন এবং তার গর্ভে জন্ম নেওয়া এক যুদ্ধশিশু এ মামলায় সাক্ষ্যও দেন। আর একটি ঘটনায় ছিল নির্বিচারে হত্যার অভিযোগ।

এছাড়া অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যায় সংশ্লিষ্টতার চারটি অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তিনটি অভিযোগে আরও ২২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল  যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

আপিলের রায়ে তিনটি অভিযোগে কায়সারের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়েছে। তিনটি অভিযোগে তার প্রাণদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কায়সারকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও আপিল বিভাগ তাকে খালাস দিয়েছে।

নিয়মঅনুযায়ী আসামি এই রায় পর্যালোচনার আবেদন করতে পারবেন। তাতে সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত না বদলালে আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। তাতেও তিনি বিফল হলে সরকার সাজা কার্যকরের পদক্ষেপ নেবে।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের আইনজীবী এস এম শাহজাহান সাংবাদিকদের বলেন, ‘রায়ের অনুলিপি পেলে ভালমত দেখে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা হবে।’

অন্যদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই রায়ে আমাদের দেশে ধর্ষণে সহযোগিতা করার দায়ে প্রথম কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। ওই অভিযোগের যে ভিকটিম, সে নিজে কোর্টে এসে সাক্ষ্য দিয়েছে এবং তার মেছের আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছে দুর্দশার কথা।

‘এই ১২ নম্বর অভিযোগটিতে চার বিচারপতিই একমত হয়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন। আর ৫ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।’

২০১৩ সালের ১৫ মে ট্রাইব্যুনাল কায়সারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে সেই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় মুসলিম লীগের এই সাবেক নেতাকে। বয়স ও স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতি বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালে তাকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেয়।

যুদ্ধাপরাধের ১৬টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে পরের বছর ২ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ কায়সারের বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। সেই বিচার শেষে ২০১৪ সলের ২৩ ডিসেম্বর তার মৃত্যুদণ্ডের রায় আসে।

সেই রায়ের পর একাত্তরের এই যুদ্ধাপরাধীকে কারাগাওে পাঠানো হয়। মঙ্গলবার আপিল বিভাগের রায়ের সময় তিনি ছিলেন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের কনডেম সেলে।

নিয়মঅনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্ট এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের পর তা ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে। সেটি হাতে পেলে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবে ট্রাইব্যুনাল। সেই মৃত্যু পরোয়ানা ফাঁসির আসামিকে পড়ে শোনাবে কারা কর্তৃপক্ষ।পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করতে পারবে আসামিপক্ষ। তবে রিভিউ যে আপিলের সমকক্ষ হবে না, তা যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ‘রিভিউ’ খারিজের পূর্ণাঙ্গ রায়েই স্পষ্ট করা হয়েছে।

রিভিউ আবেদনের নিষ্পত্তি হয়ে গেলে এবং তাতে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে আসামিকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ দেওয়া হবে। তিনি স্বজনদের সঙ্গে দেখাও করতে পারবেন।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমার বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেলে সরকার কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন – তারা আমাদেরই মা, আমাদেরই বোন। আমরা আর চোখ বন্ধ করে রাখতে পারিনা।’

বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের প্রাপ্য সম্মান দেখাতে তাদের দুর্দশা কমানোর জন্য সরকার দ্রুত  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করা হয়।

ক্ষতিপূরণ স্কিম চালুর পাশাপাশি বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের তালিকা করে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং যারা ইতোমধ্যে মারা গেছেন, তাদের মরণোত্তর সম্মান জানিয়ে স্বজনদের শোক ও দুর্দশা লাঘবের ব্যবস্থা নিতে রাষ্ট্রকে উদ্যোগী হতে বলে ট্রাইব্যুনাল।

রায়ের পর্যবেক্ষণে সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন বেসরকারি ও সামাজিক সংগঠন বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের সম্মান দেখাতে তাদের দুর্দশা কমানোর জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে আদালত আশা করে।

‘শুধু ধর্ষণের শিকার নারীদের ক্ষত দূর করার জন্য নয়, বরং আমাদের সমাজ ও জাতির ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্যও এটি করা প্রয়োজন। তাই, তাদের মানসিক-সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য বিস্তৃত ও সুশৃঙ্খল মনোযোগ ও ব্যবস্থার ওপর জোর দিচ্ছি আমরা।

###

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *