কড়ানজর
  • October 20, 2021
  • Last Update October 1, 2021 6:00 pm
  • গাজীপুর

মায়ের কবরেই চিরনিদ্রায় শায়িত বর্ষিয়ান নেতা মোহাম্মদ নাসিম

মায়ের কবরেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। বনানী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। এরআগে, বনানী কবরস্থান জামে মসজিদে তার দ্বিতীয় ও শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনুষ্ঠিত জানাজা শেষে তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করা। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে, আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও শ্রদ্ধা জানান ।

এরআগে, সকালে নাসিমের মরদেহ নেয়া হয় তার ধানমন্ডির নিজ বাসভবনে। এরপর রাজধানীর সোবহানবাগ জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার সকালে ইন্তেকাল করেন ৭২ বছর বয়সী এই বর্ষিয়ান নেতা  মোহাম্মদ নাসিম।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্ষিয়ান এ নেতার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।

এর আগে শুক্রবার (১২ জুন) রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও তার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, মেডিক্যাল বোর্ড রাতে মিটিং করেছে। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় নতুন করে হার্টে সমস্যা দেখা দিয়েছে। আগে এই সমস্যা ছিল না।

গত ১ জুন নিউমোনিয়াজনিত সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হন মোহাম্মদ নাসিম। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করা হলে ফলাফল পজিটিভ আসে। তবে সম্প্রতি মোহাম্মদ নাসিমের পরপর তিনটি করোনা টেস্টের ফলাফল নেগেটিভ এসেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৫ জুন শুক্রবার ভোরে তার স্ট্রোক হয়। সেদিনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রাজিউল হকের নেতৃত্বে অস্ত্রোপচার হয়। এর আগেও তার একবার স্ট্রোক হয়েছিল। সব মিলিয়ে তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলেই মন্তব্য করেন চিকিৎসকরা।

বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারি ছিলেন সাবেক স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, ৭৫ এ জেলখানায় হত্যাকাণ্ডের শিকার জাতীয় চারনেতার অন্যতম ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর ছেলে। মনসুর আলী মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত বাংলাদেশের প্রথম সরকারের অর্থমন্ত্রী এবং স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারের তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে মোহাম্মদ নাসিম ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের দায়িত্বে ছিলেন।

মোহাম্মদ নাসিমের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলার কাজীপুর উপজেলায়। তার বাবা শহীদ ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং মাতা আমেনা মনসুর। শিক্ষাজীবনে মোহাম্মদ নাসিম জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

রাজনৈতিক জীবনে মোহাম্মদ নাসিম বিভিন্ন সরকারের সময় জেল, জুলুম ও নির্যাতন ভোগ করেছেন। তিনি পাকিস্তানের স্বৈরশাসন. নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনসহ স্বাধীন বাংলাদেশে সব সামরিক ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথের সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। দেশের সব অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্র সৈনিক।

মোহাম্মদ নাসিম সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদে বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন । ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি  অনেক বার রাজপথে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

মোহাম্মদ নাসিম ছাত্রজীবনে বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। মোহাম্মদ নাসিম ৮০ দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

মোহাম্মদ নাসিম ১৯৮৬ প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নাসিম। পরবর্তীতে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি ওই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। রাজপথের পাশাপাশি জাতীয় সংসদেও তিনি উচ্চ কণ্ঠ ছিলেন ৷ ২০১২ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যের দায়িত্ব পান এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন।

আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর ওই সরকারে মোহাম্মদ নাসিম স্বরাষ্ট্র, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ১৪ দলকে বর্তমানে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা রয়েছে ৷

তিনি রাজনীতির পাশাপাশি সমাজকল্যাণমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঢাকাসহ নিজ এলাকা সিরাজগঞ্জে বেশকিছু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন তিনি।

ব্যক্তিগত জীবনে মোহাম্মদ নাসিম তিন সন্তানের জনক। তার স্ত্রীর নাম লায়লা আরজুমান্দ। মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় ২০০৮ সালের নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *