কড়ানজর
  • May 11, 2021
  • Last Update May 7, 2021 8:34 pm
  • গাজীপুর

মাস্টারদা সূর্য সেনের বলিদান দিবস বড্ড বেমানান নীরবতায় চলে গেল

মাস্টারদা সূর্য সেনের বলিদান দিবস বড্ড বেমানান নীরবতায় চলে গেল

কড়া নজর প্রতিবেদন –

সূর্য কুমার সেন সংক্ষেপে হলেন সূর্য সেন। শিক্ষকতা পেশাসূত্রে নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে গেল ‘মাস্টারদা’। মাস্টারদা সূর্য সেন। গত শতাব্দির ত্রিশের দশকে ব্রিটিশের ঘুম হারাম করা এক নাম। ব্রিটিশের ভাষায় ‘ডাকাত’। মুক্তিকামী মানুষের কাছে দেশপ্রেম-সংগ্রাম-সাহস-আত্মত্যাগ-চেতনার সমার্থক নমস্য বিপ্লবী। সূর্য সেনের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’র ৬৫ জন বিপ্লবী ১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিল রাত ১০ টার দিকে চট্টগ্রামে একযোগে ব্রিটিশ পুলিশের দু’টো অস্ত্রাগার, টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ কার্যালয়, রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার দুঃসাহসিক ও সফল হামলা চালান। অস্ত্র লুট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা তছনছ করে প্রশাসনকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে দেন।
সফল অভিযানের পর বিপ্লবী দলটি পুলিশ অস্ত্রাগারে সমবেত হন। সেখানে সহযোদ্ধা মাস্টারদা সূর্যসেনকে সামরিক সালাম জানিয়ে সম্মানিত করেন। সূর্য সেন জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার ঘোষণা করেন।

বাঙালির বীরত্বগাথাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাও যেন নিয়তি হয়ে গেছে। পলাশীর মীর জাফর, পঁচাত্তরের মোশতাক যেমন – চট্টগ্রামের নামটি নেত্র সেন । এই নেত্র সেন মাস্টারদার অন্যতম সহযোদ্ধা ব্রজেন সেনের ভাই।
১৯৩৪ ’র ১২ জানুয়ারি সহযোদ্ধা তারকেশ্বর দস্তিদারের সঙ্গে ব্রিটিশ শাসকরা সূর্য সেনের ‘ফাঁসি’ দেয়। হাসতে হাসতে ‘ফাঁসির রশি’ গলায় পরতে পারেননি বিপ্লবীদ্বয়। ফাঁসি কার্যকরের আগেই গায়ের জ্বালা মেটাতে ব্রিটিশ পুলিশ নৃশংসভাবে পিটিয়ে হাতুড়ি দিয়ে তাঁদের দাঁত ভাঙে, নখ থেঁতলে উপড়ে ফেলে, হাড-়পাঁজর টুকরো টুকরো করে। অচেতন বিপ্লবীদ্বয়ের দেহ ফাঁসিতে চড়িয়ে আনুষ্ঠানিকতা সারে। দুই মহান বিপ্লবীর মৃতদেহও ব্রিটিশদের ভয়ের কারণ ছিল। সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের লাশ আত্মীয়দের হাতে হস্তান্তর না করে জেল খানা থেকে ট্রাকে করে ৪ নম্বর স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর ব্রিটিশ ক্রুজার ‘দ্য রিনাউন’ এ চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের মধ্যে কোনও স্থানে়। সেখানে লোহার টুকরো বেঁধে দেহ দু’টি ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত , গণেশ ঘোষ, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন, সুশীল দাস গুপ্ত , লোকনাথ বল, নির্মল সেন, অনন্ত সিং, অপূর্ব সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, নরেশ রায়, ত্রিপুরা সেন গুপ্ত, বিধু ভূষণ ভট্টাচার্য, শশাঙ্ক শেখর দত্ত, অর্ধেন্দু দস্তিদার, হরি গোপাল বল, প্রভাস চন্দ্র বল, তারকেশ্বর দস্তিদার, মতিলাল কানুনগো, জীবন ঘোষাল, আনন্দ গুপ্ত, নির্মল লালা, জিতেন দাস গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, পুলিন চন্দ্র ঘোষ, সুবোধ দে’র মত বিপ্লবী সহযোদ্ধা পেয়েছিলেন বলে ইতিহাসে
মাস্টারদা সূর্য সেন এত কিরণ বিচ্ছুরিত এক নাম।
১৯৩০ সালের ১৮ই এপ্রিলের দুনিয়া কাঁপানো সেই অভিযানে গণেশ ঘোষের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী পুলিশ অস্ত্রাগারের এবং লোকনাথ বাউলের নেতৃত্বে দশজনের একটি দল সাহায্যকারী বাহিনীর অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে- তারা গোলাবারুদের অবস্থান শনাক্ত করতে পারেননি।
ভোররাতেই বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা করেন। এদের ধরার জন্য ব্রিটিশ সরকার ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। সূর্যসেনকে গ্রেপ্তার করতে না পারলেও সরকার ওই বছরের ২৪ জুলাই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলা বিশেষ ট্রাইবুনাল করে বিচার শুরু করে।
এদিকে ২৪ সেপ্টেম্বর সূর্যসেনের নির্দেশে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার পাহাড়তলি এলাকার ইউরোপীয়ান ক্লাবে সফল হামলা করলেও এক পর্যায়ে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। ধরা পড়ার আগেই সায়ানাইড বিষ পান করে আত্মাহুতি দেন।
এ ঘটনার পরে মাস্টারদা পটিয়ার কাছে গৈরালা গ্রামে ক্ষীরোদ প্রভা বিশ্বাসের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ওই বাড়িতে কল্পনা দত্ত, শান্তি চক্রবর্তী, মণি দত্ত, ব্রজেন সেন আর সুশীল দাস গুপ্তকে নিয়ে মাস্টারদা বৈঠক করছিলেন। পুলিশ সেখানে হানা দিলে অন্ধকারে রাতভর গুলিবিনিময় হয়। এর মধ্যে কয়েকজন বিপ্লবী গা-ঢাকা দিতে সমর্থ হন। অস্ত্রসহ ধরা পড়েন সূর্য সেন এবং ব্রজেন সেন। তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ সূর্য সেনের নিজের হাতে লেখা অর্ধসমাপ্ত আত্মজীবনীর খাতা উদ্ধার করে। খাতার শিরোনাম ছিল ‘বিজয়া’। বিচারকালে সেই বিজয়ায় লিখিত বক্তব্যই রাজদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রেও প্রমাণ হিসেবে আদালতে উপস্থাপিত হয়। ব্রজেন সেনের ছোট ভাই নেত্র সেন পুরস্কারের লোভে পুলিশকে তথ্য দিয়েছিল। বিশ্বাসঘাতক নেত্র সেন দ্রুতই বেইমানির ফল পায়। পুরস্কারের অর্থ পাওয়ার আগেই বিপ্লবীরা তাকে হত্যা করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *