কড়ানজর
  • September 22, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

ভাষা আন্দোলন বাঙলা সাহিত্যে জাগরণ তোলে

কড়া নজর প্রতিবেদনঃ-

এক ছোঁ মেরে মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার পাকিস্তান-দানবের অপচেষ্টার সময় বাঙালি টের পেল কী হারাতে বসেছিল। মায়ের ভাষার প্রতি দরদ-যত্ন-লালনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলো। এর প্রভাব পড়ল বাঙলা সাহিত্যে। নিজ ভাষায় সাহিত্য রচনার গুরুত্ব অনুধাবন করলেন বিদগ্ধজন। ২১ ফেব্রুয়ারির পর বাংলা ভাষায় এবং ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে সাহিত্য সৃষ্টির ধুম পড়ে গেল। সত্যিকার অর্থে ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশকাল এটি।

বিদ্ঘুটে রাষ্ট্র পাকিস্তান জন্মের অব্যবহিত পরেই বাংলা ভাষার উপর আঘাত এবং তা প্রতিহত করতে আন্দোলন-সচেতনতা শুরু হয়। বাঙলা ভাষার মাধ্যমে সংস্কৃতি চর্চার উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক ও ছাত্রদের উদ্যোগে ১৯৪৭’র ২ সেপ্টেম্বর ‘তমুদ্দুন মজলিস’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ভাষা আন্দোলন নানা ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত পরিণতি পায় ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রæয়ারিতে। এই তারিখটিকে স্মরণ করে সৃষ্টি হয়েছে অনেক সাহিত্য আর ইতিহাস। রচিত হয়েছে কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক,উপন্যাস, ও ছড়া।

২১ শে ফেব্রæয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার ২৪ ঘন্টার মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে কবি মাহবুব-উল আলম চৌধুরী রচনা করেন একুশের প্রথম কবিতা, ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন কমিটির আহবায়ক মাহবুব যখন ঢাকায় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের খবর পেলেন তখন তিনি জলবসন্তে শয্যাশায়ী। যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে উঠে বসলেন। তিনি সতেরো পৃষ্ঠার লম্বা কবিতা শ্রæতলিখনের মাধ্যমে লিখিয়ে নিলেন। বামপন্থি নেতা খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াসের ওপর দায়িত্ব ন্যস্ত হলো আন্দরকিল্লার কহিনূর ইলেক্ট্রিক প্রেসে সারারাত কাজ চালিয়ে সকালের মধ্যেই কবিতাটি পুস্তিকাকারে প্রকাশের। কম্পোজ ও প্রæফ দেখার কাজ প্রায় যখন শেষ তখন এসপি আলমগীর কবিরের নেতৃত্বে পুলিশ প্রেসে হানা দিল শ্রমিক-কর্মচারীরা কবিতার পান্ডুলিপি, মুদ্রিত কপি এবং লুকিয়ে ফেলেন। আর পুলিশ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাকি ছাপার কাজ গোপনে সমাধা করে কয়েক হাজার কপি তৈরি করেন। পওে অবশ্য মুসলিম লীগ সরকার কবিতাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সব কপি বাজেয়াপ্ত করে নেয়।

‘এখানে যারা প্রাণ দিয়েছে/রমনার ঊর্ধ্বমুখি কৃষ্ণচূড়ার তলায়/সেখানে দাঁড়িয়ে আমি কাঁদতে আসিনি/আজ আমি শোক বিহŸল নই/আজ আমি প্রতিজ্ঞায় অবিচল…/আমি আজ তাদের ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি/যারা আমার অসংখ্য ভাইবোনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে।..রমনার মাঠের সেই মাটিতে/কৃষ্ণচূড়ার অসংখ্য ঝরা পাপড়ির মতো/চল্লিশটি তাজাপ্রাণ আর/অঙ্কুরিত বীজের খোসার মধ্যে/আমি দেখতে পাচ্ছি তাদের অসংখ্য বুকের রক্ত।…/যারা আমার মাতৃভাষাকে নির্বাসন দিতে চেয়েছে তাদের জন্য/আমি ফাঁসি দাবী করছি/যাদের আদেশে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তাদের জন্যে/ফাঁসি দাবী করছি/যারা এই মৃতদেহের উপর দিয়ে/ক্ষমতার আসনে আরোহণ করেছে/সেই বিশ্বাসঘাতকদের জন্যে।/আমি তাদের বিচার দেখতে চাই/খোলা ময়দানে সেই নির্দিষ্ট জায়গাতে/শাস্তিপ্রাপ্তদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায়/আমার দেশের মানুষ দেখতে চায়।…’

এরপর স্মরণযোগ্য পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক একুশের প্রথম স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলার পর কবি আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘স্মৃতিস্তম্ভ’ কবিতার প্রতিবাদস্বরূপ সোচ্চার বাণী –

‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার ? ভয় কি বন্ধু, আমারা এখনো/চার কোটি পরিবার/খাড়া রয়েছি তো। যে ভিত কখনো কোন রাজন্য/পারেনি ভাঙতে/হীরার মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার/খুরের ঝটিকা ধূলায় চূর্ণ যে পদপ্রান্তে/যারা বুনি ধান/গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাপর চালাই/সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।/ইটের মিনার/ভেঙেছে, ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দেখ একবার আমরা জাগরী/চার কোটি পরিবার’।/এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,/শিয়রে যাহার ওঠেনা কান্না, ঝরেনা অশ্রæ?/হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং/সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং/এ-কোন মৃত্যু ? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন।

হাসান হাফিজুর রহমান ভাষা আন্দোলন নিয়ে লিখেছেন ‘মিছিলের এক মুখ’, ‘ ফেব্রুয়ারির ঢাকা আমার’, ও ‘অমর একুশে’। এ সব কবিতায় শিল্পিত হয়েছে বাঙালির আত্মজাগরণের ইতিহাস।‘অমর একুশে’ কবিতায় কবি লিখেন-‘আবুল বরকত নেই; সেই অস্বাভাবিক বেড়ে ওঠা/বিশাল শরীর বালক; /মধুর ষ্টলের ছাদ ছুঁয়ে হাঁটতো যে/তাঁকে ডেকো না;/সালাম, রফিকউদ্দিন, জব্বার, কি বিষন্ন থোকা থোকা নাম’

একুশের এক অব্যক্ত ব্যঞ্জনা প্রস্ফুটিত হয়েছে আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর ‘কোনো এক মাকে’ কবিতায়। ‘কুমড়ো ফুল/শুকিয়ে গেছে,/ঝরে পড়েছে ডাঁটা,/পুঁই-লতাটা নেতানো/‘খোকা এলি?’/ঝাপসা চোখে মা তাকায়/উঠোনে, উঠোনে/যেখানে খোকার শব শকুনিরা ব্যবচ্ছেদ করে।/এখন,/মা’র চোখে চৈত্রের রোদ/পুড়িয়ে দেয় শুকুনিদের।/তারপর,/দাওয়ায় বসে/মা আবার ধান ভানে,/বিন্নি ধানের খই ভাজে,/খোকা তার কখন আসে!/এখন,/মা’র চোখে শিশির ভোর,/স্নেহের রোদে/ভিটে ভরেছে।’

একুশে চেতনাই বাঙালিকে স্বাধিকার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। বাঙালি আত্মসচেতন হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষার প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ‘শহীদ মিনারে কবিতা পাঠ’ কবিতায় লিখেন,‘আমরা ক’জন/শহীদ মিনারের পাদপীঠে এসে দাঁড়ালাম/ ফেব্রুয়ারির শীত বিকেলে।/আমাদের কবিতা পাঠের সময় মনে হয়/তারা এলেন শহীদ মিনারে, নিঃশব্দে কিছুক্ষণ/আসা যাওয়া করে চত্বরে ক’জন/শহীদ দাঁড়ান পাদপীঠে”।

মহাদেব সাহার ‘একুশের গান’ খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘ফেব্রæয়ারিতে জনৈক বাগান মালিক’ ফজলে লোহানীর ‘একুশের কবিতায়’ একুশের চেতনার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। মহান একুশে ফেব্রæয়ারিকে কেন্দ্র করে একটি শোকার্ত সঙ্গীত আমাদের কাছে আজ ব্যাপক পরিচিতি। এ প্রসঙ্গে আব্দুল গাফফার চৌধুরীর সেই বিখ্যাত গানটি প্রণিধানযোগ্য-/‘আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রæয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।/ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রæ-গড়া এ ফেব্রæয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি।/আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রæয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’।

আবদুল লতিফের ‘একুশের গানে’ ভাষা-আন্দোলনের প্রভাব জেগে উঠেছে,/‘যে শুনাইছে আমার দেশের গাঁও গেরামের গান/নানান রঙের নানান রসে ভইরাছে তার প্রাণ।/ঢপ কীর্তন ভাসান জারি/গাজীর গীত আর কবি সারি—/তার ভাটিয়ালি গানের সুরে/মনের দুক্ষু যায় রে দূরে/বাজায় বাঁশি সেই না সুরে/রাখাল বনের ছায়।—-/ঘুম পারাইনা গাইতো যে গান/মোর দুঃখিনী মায়।’

ভাষা-আন্দোলনের অনুষঙ্গে অনেক ছোটগল্প রচিত হয়েছে করেছেন। ভাষা-আন্দোলনের প্রথম বার্ষিকী (১৯৫৩) উপলক্ষে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রæয়ারি’ ভাষা-আন্দোলনের উপর ছোট গল্পের সংকলন। শওকত ওসমানের ‘মৌন নয়’, সাইয়িদ আতীকুল্লাহর ‘হাসি’ অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের ‘দৃষ্টি,’ মিন্নাত আলীর ‘রুম বদলের ইতিকথা’, সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘খরস্রোত’, নূর-উল-আলমের ‘একালের রূপকথা,’ রাবেয়া খাতুনের ‘প্রথম বধ্যভূমি,’ মঈদ-উর-রহমানের ‘সিঁড়ি’ সেলিনা হোসেনের ‘দীপান্বিতা’ শহীদুল্লা কায়সারের ‘এমনি করেই গড়ে উঠবে,’ সৈয়দ শামসুল হকের ‘সম্রাট,’ মুর্তজা বশীরের ‘কয়েকটি রজনীগন্ধা,’ বশীর আল্ হেলালের ‘বরকত যখন জানত না সে শহীদ হবে’, শওকত আলীর ‘অবেলায় পুনর্বার’ রাজিয়া খানের ‘শহীদ মিনার,’ রিজিয়া রহমানের ‘জোৎস্নার পোস্টার’, মাহমুদুল হকের ‘ছেঁড়া তার’, মঈনুল আহসান সাবেরের ‘মরে যাওয়ার সময় হয়েছে’, রশীদ হায়দারের ‘সুদূরের শহীদ,’ এবং জহির রায়হানের ‘একুশের গল্প,’ ‘সূর্যগ্রহণ’, কয়েকটি সংলাপ’ ইত্যাদি ছোটগল্পে ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপট মানুষের জীবনের এক একটি খন্ড খন্ড ছবি উদ্ভাসিত হয়েছে।

ভাষা-আন্দোলন ছিলো জাতির অস্তিত্বের লড়াই। আর এই অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধ সাহিত্য রচিত হয়েছে। এ পর্যায়ে আব্দুল হকের ‘ভাষা আন্দোলনের আদি পর্ব’, বদরুদ্দিন উমরের তিন খন্ডে ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি,’ ‘ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’, ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলামের ‘আমাদের মাতৃভাষা চেতনা ও ভাষা আন্দোলন’, সৈকত আসগরের ‘ভাষা আন্দোলন ও শহীদ রফিক’, ড. সাঈদ-উর-রহমানের ‘পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আন্দোলন’, ইত্যাদি ভাষা-আন্দোলন নির্ভর সমৃদ্ধ প্রবন্ধ সাহিত্য সম্ভার।

ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাপুঞ্জ নিয়ে শিল্পসফল রচিত নাটকের সংখ্যা খুব কম । এ প্রসঙ্গে মুনীর চৌধুরী বাংলাদেশে ‘কবর’ (১৯৫৩) নাটক লিখে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। সংক্ষিপ্ত আয়োজনে এই একাঙ্কিকায় মুনীর চৌধুরী ধারণ করেছেন বাঙালি জাতিসত্তার সম্মিলিত জাগরণের গৌরবোজ্জ্বল চেতনা।

উপন্যাসেও ভাষা-আন্দোলনের বীজ জাগ্রত হয়েছে। সমাজসচেতন প্রগতিশীল উপন্যাসিক জহির রায়হানের (১৯৩৩-৭২) রচিত ভাষা-আন্দোলন ভিত্তিক প্রথম উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ (১৯৬৯) । এটি একটি খ্যাতনামা উপন্যাস। সমালোচকদের মতে, বিষয় ভাবনার গৌরবোজ্জ্বল ‘আরেক ফাল্গুন’ জহির রায়হানের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। বায়ান্নর রক্তস্নাত ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয়েছে এ উপন্যাস। সামরিক শাসনের নিগ্রহের মধ্যে বাস করেও, একুশের মর্মকথা-উৎসারিত আরেক ফাল্গুন’ পাঠ করে আমরা হয়ে উঠি সাহসী প্রত্যয় পুরুষ। এ উপন্যাসের জমিনে লক্ষ করি, আসাদ, মুনিব, রসুল, সালমা প্রভৃতি চরিত্র অঙ্কনে শিল্পী নির্ভীক চিত্তের পরিচয় দিয়েছেন তা প্রশংসার দাবি রাখে। জহির রায়হানের এ উপন্যাসের ভাষা আবেগপ্রবণ, চিত্রাত্মক চিত্র নাট্যধর্মী এবং কবিতাস্পর্শী।

‘আকাশে মেঘ নেই। তবু ঝড়ের সঙ্কেত।

বাতাসে বেগ নেই। তবুু, তরঙ্গ সংঘাত।/কন্ঠে কন্ঠে এক আওয়াজ, শহীদদের খুন/ভুলবোনা।/বরকতের খুন ভুলবো না’।

কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান ১৯৮৫ সালে ‘আর্তনাদ’ উপন্যাস লিখেন। রাজনৈতিক উপাদান প্রেক্ষাপট সহযোগে। তিনি বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের চেতনাবীজকে বাঙালি জাতিসত্তার মৌল আবেগের সঙ্গে সম্পর্কিত করে বর্ণনা করেছেন। রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন লেখক লিখেছেন, ‘এত রক্ত জননী বাংলা ভাষা, এত রক্ত ছিল এ শরীরে’।

এই উপন্যাসে ‘কোরাস’ অংশে চলমান বাসের মধ্যে সীমাহীন নিঃশব্দতায় ভাষা-আন্দোলনে নিহত শহিদের পিতার আর্তচিৎকার সৃষ্টি করেছে গভীর বেদনাময় পরিবেশ। আর ‘একাকী’ অংশে আলী জাফরের আত্মা অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে নিহত আত্মার সর্বব্যাপ্ত আত্মা উন্মোচন এক নতুন শিল্পমাত্রায় ব্যক্ত হয়েছে এবং সেই সাথে ব্যক্তি অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিবেদনাকে দেশ-মাতৃকার মর্মমূলে সংস্থাপন করে সুচারুভাবে উপস্থাপনা করেছেন দায়বদ্ধ কথাশিল্পী শওকত ওসমান।

ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সেলিনা হোসেন রচনা করেছেন দুইটি উপন্যাস, ‘যাপিত জীবন’ (১৯৮১) এবং ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’ (১৯৮৭) । ‘যাপিত জীবন’ উপন্যাসে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫২ সালে ভাষা-আন্দোলনের যাবতীয় ঘটনাপুঞ্জকে নন্দনদৃষ্টি দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র জাফরের অস্তিত্বের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। আর চল্লিশের উত্তাল ইতিহাসকে ধারণ করে আছে বলে ‘নিরন্তর ঘন্টাধ্বনি’ হয়ে উঠেছে ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের এক অমূল্য শৈল্পিক দলিল।

আমাদের ভাষা-আন্দোলনের ক্যানভাসে ছড়া সাহিত্যও যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। অসংখ্য ছড়া রচিত হয়েছে ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। এ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করা যায় আল মাহমুদের সেই বিখ্যাত ছড়া ‘একুশের ছড়া’।

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/দুপুর বেলার অক্ত/বৃষ্টি ঝরে, বৃষ্টি কোথায়/বরকতেরই রক্ত’।

মসউদ উশ শহীদ তাঁর ‘ভাষার জন্যে’ ছড়ায় লিখেছেন-

‘ভাষার জন্যে লড়াই হলো/লড়াই করে আস্থা পেলাম,/ভাষার জন্যে লড়াই করে/স্বাধীনতার রাস্তা পেলাম’।

রুহুল আমিন বাবুল তাঁর ‘ভাষা নিয়ে’ ছড়ায় তুলে ধরেছেন ভাষা-আন্দোলনের চেতনা।

‘ভাষা নিয়ে আন্দোলনে/দুঃখ-সুখের কান্নাকাটি যতো/সব কিছুকে পায় মাড়িয়ে/স্বাধীনতা এলো বীরের মতো’।

বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের একুশে ফেব্রুয়ারি অমর ও অবিনশ্বর। ভাষা-আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনে যেমন এনে দিয়েছে গৌরবের তাৎপর্য, তেমনি আমাদের শিল্প-সাহিত্যকে নতুন প্রাণের স্পন্দনে প্রভাবিত করেছে। তাই ভাষা-আন্দোলন ও বাঙলা সাহিত্য সমান মর্যাদায় বাঙালি জাতির ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *