কড়ানজর
  • September 28, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ ১৪ দিন

বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ ১৪ দিন

কড়া নজর প্রতিবেদনঃ
১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট খন্দকার মোশতাক নিজের বাসা থেকে রান্না করে রাতের খাবার নিয়ে যান বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাসায়। খাবার ম্যেনুতে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় সরিষা ইলিশ , ছোট মাছের ভুনা , কয়েক প্রকার ভর্তা ছিল। বঙ্গবন্ধুর আপত্তি সত্তে¡ও মাঝে-মধ্যেই বাসা থেকে মোশতাক খাবার এনে নিজে উপস্থিত থেকে খাবার টেবিলে পরিবেশন করতেন। মাত্র ৬-৭ ঘন্টা পর যাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হবে, তাদের জীবনের শেষ আহারটা হত্যা পরিকল্পনার প্রধান কুশীলব বাসা থেকে আনিয়ে খাওয়ালেন ! খন্দকার মোশতাকের মতো দূরাত্মা-ধূর্ত – ঠান্ডা মাথার খুনির পক্ষেই এটা সম্ভব। ইতিহাসে এ রকম নজির দ্বিতীয়টি আছে কী-না জানা যায়নি।
১৯৭৫ সালের ১ থেকে ১৪ আগস্ট, জীবনের শেষ দু’সপ্তাহ, রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্মব্যস্ত সময় কাটিয়েছিলেন। সরকারি কর্মসূচির বাইরে গঠিত নতুন দল বাকশালের (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করতে ছিলেন ভীষন ব্যস্ত। এই দুই সপ্তাহ খুনিরাও ছিল বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি। হন্তারকরা নিজেদের হিং¯্রতা-প্রতিহিংসা-লোভ নিপুণ অভিনেতার মত লুকিয়ে রেখে বঙ্গবন্ধুর আশপাশে অবস্থান করেছে।
১৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হির বিশেষ দূত সাক্ষাৎ করেন। সকাল ১০টায় দেখা করেন নৌবাহিনীর প্রধান। তিনি ১৫ আগস্ট সকালে বেতারে গিয়ে মোশতাকের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দেন অন্য বাহিনী-প্রধানদের সঙ্গে নিয়ে। সকাল সাড়ে ১০ টায় মোশতাকের অতি ঘনিষ্ট বেতার ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং সকাল ১১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রামের পটিয়ার নুরুল ইসলাম চৌধুরী ( মোশতাক সরকারের শিল্প প্রতিমন্ত্রী) ও বিমানবাহিনীর প্রধান এ কে খোন্দকার দেখা করেন। সকাল সাড়ে ১১টায় দেখা করেন জাতীয় লীগ সভাপতি আতাউর রহমান খানের দুই কন্যা। এদের জামাতারা এবং সহোদররা পরে বিএনপিতে যোগ দেয়। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বোস প্রফেসর ড. আবদুল মতিন চৌধুরী দেখা করে পরদিন সমাবর্তন আয়োজন সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুকে অবহিত করেন। সন্ধ্যা ৬টায় শিক্ষামন্ত্রী প্রফেসর মোজাফফর আহমদ চৌধুরী ও শিক্ষা সচিব সাক্ষাৎ করেন। ড. মোজাফফর পরে জিয়ারও শিক্ষা উপদেষ্টা হয়েছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শেষ সাক্ষাৎ করেন সংসদ সদস্য অধ্যাপক আজরা আলী এবং শ্রীমতি সুপ্রভা মাঝি। আজরা আলী মোশতাকের ডেমোক্র্যাটিক লীগের নেত্রী হয়েছিলেন। সুপ্রভা সম্পর্কে পরে কিছু জানা যায়নি। অনুমান করা যায়, আজরা আলী সেদিন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে হয়তো এমন তথ্য নিয়েছেন, যা হত্যাকারীদের পরিকল্পনায় কাজে লেগেছে। অধ্যাপক আজরা আলী ১৫ আগস্ট মোশতাকের পার্শ্বচর হয়ে যান। এমনকি খুনিদের পক্ষে সাফাই গেয়ে অন্য সাংসদদের মোশতাকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের জন্য চাপ প্রয়োগ করতেন। পরবর্তীতে তিনি মোশতাকের দল ডেমোক্র্যাটিক লীগও করেন।
১৩ আগস্ট বুধবার সকাল ১১টায় যুক্তরাষ্ট্রে নবনিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এমআর সিদ্দিকী বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। দুপুরে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। মওদুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। ১৫ আগস্টের সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুর প্রধান অতিথি থাকার কথা ছিল। ওই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় চাঁদপুরের এমপি এমএ রব সাক্ষাৎ করেন।
১২ আগস্ট মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন অর্থমন্ত্রী ড. আজিজুর রহমান মল্লিক। তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী কর্নেল ফারুকের সম্পর্কে আপন খালু এবং মোশতাকের অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিন দিন পর ১৫ আগস্ট সন্ধ্যায় শপথ নেন। সন্ধ্যা ৬টায় দেখা করেন (পাকিস্তানি নাগরিক) সফররত কমনওয়েলথ সেক্রেটারি অধ্যাপক এএফ হোসেন।
১১ আগস্ট সোমবার শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী সকাল ১১টায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি বাকশালের অঙ্গ সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি ছিলেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠকারী ইউসুফ আলী এই সাক্ষাতের চার দিন পর মোশতাকের মন্ত্রী হন। পরে জিয়াউর রহমানেরও শিক্ষামন্ত্রী হয়েছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন কর্মকমিশনের সদস্য আযহারুল ইসলাম।
১০ আগস্ট রোববার ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন। পাকিস্তান জামানা হতে এই ছুটি বহাল ছিল। এরশাদ যুগে রোববার ছুটি বাতিল হয়। ১০ আগস্ট বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ৩২ নম্বরে কাটান। অবশ্য সারাদিনই বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জেলা থেকে নেতা-কর্মীরা ৩২ নম্বরে আসেন। বঙ্গবন্ধু তাদের পারিবারিক খোঁজ-খবর নেন। নবগঠিত দল বাকশাল নিয়ে কথা বলেন।
৯ আগস্ট শনিবার বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার স্থানীয় প্রতিনিধি ড. স্যাম স্ট্রিট সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতপ্রার্থী হন। সকাল ১১টায় দেখা করেন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী ও সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সন্ধ্যা ৬টায় বাকশালের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান ও কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যসহ অন্যরা সাক্ষাৎ করেন। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর বাকশাল নেতাদের উদ্দেশে শেষ নির্দেশনা ও শলাপরামর্শ। সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় অ্যাটর্নি জেনারেল দেখা করেন।
৮ আগস্ট শুক্রবার সকাল ১০টায় প্রথম ও দ্বিতীয় কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানদ্বয় দেখা করেন। সকাল সাড়ে ১০টায় রেল প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আলতাফ হোসেন এবং সাড়ে ১১টায় পানি, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মোমিনউদ্দিন আহমদ সাক্ষাৎ করেন। এরা দুজন পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। সৈয়দ আলতাফ ছিলেন ন্যাপ (মুজাফফর) নেতা।
৭ আগস্ট বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টায় সুইজারল্যান্ডের নয়া রাষ্ট্রদূত পরিচয়পত্র পেশ করেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ডে’ রূপান্তর করার স্বপ্নের কথা বলেন। পরদিন সংবাদপত্রে তা ছাপা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী, ১১টায় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী সাক্ষাৎ করেন। এরা দুজনে পরে মোশতাকের মন্ত্রী হন। বেলা ১২টায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন বিদেশ সফরের প্রাক্কালে সাক্ষাৎ করেন, যা ছিল শেষ সাক্ষাৎ। এই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার সমর সেন সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎকালে মিস্টার সেন সতর্ক করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে নানা ষড়যন্ত্র সম্পর্কে।
৬আগস্ট বুধবার দুপুর ১২টায় শ্রমমন্ত্রী জহুর আহমদ চৌধুরী এবং ১২টা ১০ মিনিটে সংস্কৃতি, তথ্য ও বেতারমন্ত্রী কোরবান আলী ও প্রতিমন্ত্রী তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং সচিব মতিউল ইসলাম দেখা করেন। তাহের উদ্দিন ঠাকুর মোশতাকের ঘনিষ্টজন এবং ১৫ আগস্টের নারকীয় যজ্ঞের অন্যতম কুশীলব।
৫ আগস্ট মঙ্গলবার সকাল ১০টায় সাক্ষাৎ করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ই এ বোস্টার। বোস্টার জানতেন খুনিদের তৎপরতা। তিনি শেখ মুজিবকে ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করেন নি। বরং ঘটনার অনুঘটক হিসেবে তার ভূমিকা ছিল। আমেরিকার অবমুক্ত করা গোপন নথিতে এর প্রমান মেলে। সকাল সাড়ে ১০ টায় দেখা করেন শিল্পমন্ত্রী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামরুজ্জামান। বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে সিলেটের সাংসদ মোহাম্মদ ইলিয়াস, কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী ও গিয়াসউদ্দিন চৌধুরী সাক্ষাৎ করেন। এই তিন সাংসদের কেউই মোশতাককে সমর্থন করেন নি। এর মধ্যে মানিক চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। এদিন সন্ধ্যা ৬টায় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শামসুর রহমান বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন এবং গাইড লাইন নেন। ২০ আগস্ট শামসুর রহমান মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক আশরাফুজ্জামান খান।


৪ আগস্ট সোমবার সকাল ১০টায় দেখা করেন পাকিস্তান ফেরত মেজর জেনারেল মাজেদুল হক। ঢাকায় আসার আগের দিনও পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি করেছেন। ঢাকায় স্ক্রিনিং বোর্ড তাকে বাদ দেয়। কিন্তু তদবিরে সফল হয়ে সেনাবাহিনীর চাকরি ফিরে পান। পরে জিয়া-খালেদার মন্ত্রী হন।

এই দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় মোয়াজ্জেম আহমদ চৌধুরী, সন্ধ্যা ৬টায় জাতীয় কৃষক লীগ নেতা রহমত আলী এমপি সাক্ষাৎ করেন। তিনি মোশতাকের ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ কর্মসূচির কর্ণধার ছিলেন।

সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে মস্কোতে নিয়োগপ্রাপ্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামসুল হক সাক্ষাৎ করেন।


২ আগস্ট শনিবার সকাল পৌনে ১০টায় উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ইয়াং ফপ দেখা করেন। সাড়ে ১০ টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কফিলউদ্দিন মাহমুদ, সন্ধ্যা ৬টায় সাবেক এমসিএ মোশাররফ হোসেন চৌধুরী এবং সোয়া ৬টায় সিলেটের মোস্তফা শহীদ এমপি সাক্ষাৎ করেন।
১ আগস্ট শুক্রবার দুপুর ১টায় প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী এবং দুপুর দেড়টায় পাহাড়ি নেতা মংপ্রæ সাইন সাক্ষাৎ করেন।
১ থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি সাক্ষাৎ করেছেন প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নুরুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি মোশতাকের মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য ছিলেন। এই মন্ত্রীর অধীনে ছিল সশস্ত্র বাহিনী। তার নিয়ন্ত্রণাধীন সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর একাংশ সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে নুরুল ইসলাম চৌধুরী ষড়যন্ত্রে পুরোপুরি সম্পৃক্ত ছিল। তৎকালীন সেনা বাহিনীর উর্ধ্বতন সকল কর্মকর্তা অভ্যুত্থানের সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের নির্মোহ বেসামরিক পূর্ণাঙ্গ তদন্ত না হওয়ায় সেনাবাহিনীর কোন্ কোন্ উর্ধ্বতন কর্মকর্তা খুনিদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তা জাতির সামনে আজও পরিস্কার নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *