কড়ানজর
  • September 27, 2021
  • Last Update September 27, 2021 10:45 am
  • গাজীপুর

বঙ্গবন্ধুর অন্তরাত্মা কী টের পেয়েছিল ট্র্যাজেডি আসন্ন !

বঙ্গবন্ধুর অন্তরাত্মা কী টের পেয়েছিল ট্র্যাজেডি আসন্ন !

কড়া নজর প্রতিবেদনঃ

‘তিনি জানতেন না, আরেকটি সন্ধ্যা তার জীবনে আসবে না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু যেন বুঝতে পারছিলেন তার সময় ফুরিয়ে আসছে’।

বঙ্গবন্ধুর (রাষ্ট্রপতির) একান্ত সচিব ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন সরকারি বার্তা সংস্থা’র (বাসস) সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কথাগুলো বলেন। ফরাসউদ্দিন পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর হন।

সপরিবারে নিহত হওয়ার কয়েকঘন্টা আগে বঙ্গবন্ধুর গণভবনে শেষদিনের শেষ মুহূর্তের কর্মব্যস্ততা-আবেগ-অনুভূতি-বিষন্নভাব ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের স্মৃতিচারণার বিষয়বস্তু।

ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বাসস’কে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ বিকালটা গণভবনে অন্যান্য দিনের মতো রুটিন কাজের বাইরে আরও দ’ুটি বিশেষ প্রস্তুতি চলছিল। একটি হচ্ছে, পরদিনের (১৫ আগস্ট ’৭৫) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, তিন কর্মকর্তার বিদায় অনুষ্ঠান। সেদিন বিদায় নিলেন রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, যুগ্ম সচিব এম মনোয়ারুল ইসলাম এবং রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল জামিলউদ্দিন আহমদ। ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, এম মনোয়ারুল ইসলাম অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহনের জন্য ১৭ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। আর কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদের রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের পদ থেকে পদোন্নতি পেয়ে ডাইরেক্টর ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিএফআই, বর্তমানে ডিজিএফআই) পদে যোগ দেয়ার কথা ছিল।

একসঙ্গে তিন কর্মকর্তার বিদায়ে বঙ্গবন্ধুর মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। অনুষ্ঠান শেষে গণভবন থেকে বিদায়ের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মনোয়ার আর ফরাস দু’দিন পরেই চলে যাবে; ছেলে দুটো মায়া লাগিয়ে যাচ্ছে। খারাপ লাগবে খুবই। ভাগ্যিস জামিল এখানেই থাকছে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আবদুল মতিন চৌধুরীর সঙ্গে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, বক্তব্যের বিষয়বস্তু, শিক্ষার মান বাড়ানোর কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এমনকি খাবার মেন্যু নিয়েও কথা বলেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ^বিদ্যালয়ের তরফে বঙ্গবন্ধুকে ‘সম্মানসূচক ডক্টর অব ল’ ডিগ্রী প্রদান করবে। কর্মচারীদের আন্দোলন সমর্থন করায় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে প্রতিবাদী ছাত্র নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এক সময় বহিস্কৃত হয়েছিলেন। সেই বিশ^বিদ্যালয়ই তাঁকে ‘ডক্টর অব ল’ ডিগ্রী দিয়ে সম্মানিত করছে। বিষয়টি নিয়ে বঙ্গবন্ধু উপাচার্য মো. আবদুল মতিন চৌধুরীর সঙ্গে মৃদু রসিকতাও করেন।

ভারাক্রান্ত বঙ্গবন্ধু

১৪ আগস্ট ’৭৫ দুপুরে নোয়াখালীতে ভারতীয় একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা কবলিত হওয়ার পরিবেশটা ঘোমট রূপ নেয়। সন্ধ্যায় গণভবন থেকে ৩২ নম্বরের বাড়িতে ফেরার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কয়েক কদম হেঁটে তাকে নিতে আসা কালো গাড়ির সামনে এসে ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেন । বঙ্গবন্ধুর মতো লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে দ্বিধাহীন, দৃঢ়চেতা,আপসহীন, অবিচল ব্যক্তিত্ববানের এ আচরণ বেমানান। পরক্ষণেই তিনি নিজেকে সামলে স্বভাবসূলভ গাড়িতে বসলেন। বঙ্গবন্ধুর তখনকার একান্ত সচিব বলেন, ‘সেদিন গণভবন থেকে ঘরে ফেরার মুহূর্তে অন্যদিনের মতোই সচিবদের কাছ থেকে বিদায় নিলেও নিভৃতে এক বিষন্নতার সুরই যেন বেজে উঠেছিল সবার হৃদয়ে।’

ফরাসউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রতিদিন কাজ শেষে গণভবনের সামনের লনে কিছু সময় পায়চারি করতেন। গাছের পরিচর্যায় ঘাটতি আছে কী-না , লেকের পানি-মাছের বিচরণ স্বাভাবিক কী-না খেয়াল করতেন। সন্ধ্যায় গণভবনের বাইরে সহকর্মীদের নিয়ে কিছু সময় মুক্ত আলোচনা করতেন। সেদিন এ সবের কিছুই করেননি তিনি।

প্রসঙ্গতঃ ১৪ আগস্ট মধ্যরাতের পরে বঙ্গবন্ধুর বাসা আক্রান্ত হলে তিনি নিজে সেনাবাহিনীর প্রধান, পুলিশ প্রধানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সকল সংস্থা প্রধানকে ফোন করেন। কেউ স্ত্রীকে দিয়ে ফোন ধরিয়েছেন। অনেকেই রাত জাগছিলেন ভিন্ন খবর শুনার আশায়,তাই বঙ্গবন্ধুর ফোন ধরেননি। কেউ ফোন ধরে ‘ব্যবস্থা নিচ্ছি স্যার’ বলে রিসিভার উঠিয়ে রেখেছেন।

বঙ্গবন্ধুর মনোজগতে ওই পরিস্থিতিতে কী ভাবনা খেলা করছিল তা জানার কোন উপায় নেই। নিজেকে বিশে^র সবচেয়ে অসহায় রাষ্ট্রনায়ক মনে করছিলেন; না-কি বাঙালির ললাট-লিখন নিয়ে ভাবনায় নিজের ললাটে ভাঁজ ফেলেছিলেন ?

বাঙালি-বাঙালি করে বঙ্গবন্ধু জীবনের এক তৃতীয়াংশ জেলে কাটিয়েছেন , বাববার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে পুনরায় পূর্ণ উদ্দমে লড়াই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ছিনিয়ে দেশের মাটিতে পা রেখে আবেগতাড়িত হয়ে প্রথম কথাটাই বলেন, ‘আজ আমার জীবন সার্থক, বাঙালি আজ স্বাধীন… .’। সেই বঙ্গবন্ধু যখন টের পান চারদিকে কুচক্রি, সকলের চোখ গদির দিকে। তখন ঘাতকের বুলেট তাঁর বিশাল দেহ ঝাঁঝরা করার আগেই অসংখ্যবার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে, মরণ হয়েছে বারবার। তাঁর মতন চিরসংগ্রামী ব্যক্তিত্ব অবশ্যই পরিবেশ টের পেয়েছেন। শুধু সময়টা অজানা ছিল।

ব্যতিক্রম কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমদ। বঙ্গবন্ধুর ফোন ধরেন জামিলের স্ত্রী। কালবিলম্ব না করে ফোর্স ৩২ নম্বরে মার্চ করার নির্দেশ দিয়ে নিজে জিপ নিয়ে ৩২ নম্বরের দিকে ছুটেন কর্নেল জামিল। পথে সোবহানবাগ মসজিদের কাছে খুনিরা বাঁধা দেয়। উপেক্ষা করে এগুনোর চেষ্টা করলে এক ঝাঁক বুলেট তার বুক ঝাঁঝরা করে দেয়।

#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *