কড়ানজর
  • September 22, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

পেঁয়াজ এবং হিঙ – যমজ ভাই

কড়া নজর প্রতিবেদন-

হিঙ আর পলান্ডু বা পেঁয়াজ – আফগান ও তুর্কিদের কাছ থেকে  বাঙালিরা গ্রহন করে I কালক্রমে হিঙ ছাপিয়ে পেঁয়াজ বাঙালির রসনাবিলাসে প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে । পেয়াঁজের রস কাঁচা মাংস বা মাছের মধ্যে গাঢ় ঝোল তৈরি করে , স্বাদও দেয় পাল্টে । তা ছাড়া পেঁয়াজের দারুন ভেষজগুণ থাকায় এটি রসুইঘরে পাঁচকদের এত আরাধ্য ।  হিঙ গাজর প্রজাতির একটি ক্ষুদ্র গাছ বিশেষ। এই গাছ মোটামুটি পাঁচ বৎসর পর্যন্ত বাঁচে। এক একটি হিঙের গাছ থেকে আধ থেকে এক লিটার হিঙয়ের দুধ নির্গত হয়। এই দুধ থেকেই হিঙ বানানো হয়।   এখন নিরামিষ রান্নায় শুধু হিঙের ব্যবহার হয় ।এক সময়, নিরামিষ বা আমিষরন্ধন – হিঙ ছিল অপরিহার্য। এখন পেঁয়াজের ব্যবহার সর্বাত্মক, তবে নিরামিষে পরিত্যাজ্য । আমিষ বা নিরামিষে এখনও হিঙ ব্যবহার হয়, প্রধান মশলা হিসেবে নয়, অনুষঙ্গ হিসেবে। খাসির মাংসে গন্ধ ! – একটু হিঙ দিলে গন্ধটা চলে যাবে। আবার নিরামিষ রান্নাতে পেঁয়াজের ঘ্রাণ আনতে আদার রসে হিঙ ভিজিয়ে ফোড়ন দিলেই কাজ হয়ে যাবে। ডালে হিঙের ব্যবহারে রান্নার স্বাদ বাড়িয়ে তুলে বহুগুণ।
প্রাচীণ খাবার হিঙ। এটা আসাফোয়েটিডা। ফেরুলা গোত্রের উদ্ভিদের মূল থেকে হিঙ সংগৃহিত হয়। ভারত ও নেপালের মতো বেশ কয়েকটি দেশে হিঙ চিকিৎসার উপকরণ হিসাবেও ব্যবহৃত হয়।
হিঙের গন্ধ স্বাদ ভিন্ন মাত্রা পায় যখন এটি তেল বা ঘিতে ভুনা হয়।

পেঁয়াজ
পেঁয়াজ আসলে কোন সবজি নয় ,মশলা জাতীয় উদ্ভিদ।এর বৈজ্ঞানিক নাম এলিয়াম সেপা।এ জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে রসুন, শ্যালট, লিক, চাইব এবং চীনা পেঁয়াজ।
রসুনের মতোই এর গোত্র হচ্ছে লিলি। এলিয়াম সেপা বা পেঁয়াজ যা মূলত একটি বাল্ব।
আমাদের দেশের পেঁয়াজ তেমন বড় হয় না। শুধু অন্য রান্নার অনুষঙ্গ নয়, কাঁচা খেতেও পেয়াজ বেশ সুস্বাদু। এছাড়া সরাসরি কাঁচা পেঁয়াজ, ভর্তা, আচার এবং সালাদ হিসেবেও পেঁয়াজের কদর কম নয়।
পেঁয়াজের রয়েছে বেশ কিছু স্বাস্থ্যগুণও। সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ তো বটেই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চাহিদা রয়েছে পেঁয়াজের।

বেশ কয়েক দিন ধরেই বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজারে ঝাঁজ বাড়ছে।২৯ সেপ্টেম্বর ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাদের রপ্তানি নীতি সংশোধন করে পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার পর বাংলাদেশের বাজারে ঘণ্টার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পেয়াজের দাম।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় ভারত এবং চীনে।
সেসব দেশগুলোতেই প্রধানত পেঁয়াজ হয় যেখানে বেশি বৃষ্টি হয় না। পাশাপাশি হাল্কা শীত থাকে। সেজন্যই বাংলাদেশে পেঁয়াজ হয় শীতকালে। সেসময় দামও কম থাকে’।

বাংলাদেশে যে সব এলাকায় শীত বেশি থাকে সেসব এলাকায় পেঁয়াজ বেশি জন্মায়।
আকারে বড় না হলেও বাংলাদেশের পেঁয়াজের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এটি ঝাঁজালো বেশি হয়। কারণ এতে এলিসিনের মাত্রাটা বেশি থাকে। যা রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।পেঁয়াজ আসলে মশলা জাতীয় খাবার যার মূল উপাদান পানি, কার্বোহাইড্রেট ও ফাইবার।তবে পেঁয়াজে পানির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি-প্রায় ৮৫%। এছাড়াও পুষ্টিগুণ বলতে গেলে, ভিটামিন সি, বি এবং পটাসিয়াম থাকে।পেঁয়াজের খোসা ছাড়ালে যে গাঢ় বেগুনি রঙের একটি আস্তরণ পাওয়া যায় এতে বেশি পরিমাণে এ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। জ্বালাপোড়া বা প্রদাহ নিবারণ করে এমন উপাদানও রয়েছে পেঁয়াজে। এটি হাড়েরও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।শরীরে পটাসিয়াম এবং মিনারেল বা খনিজের চাহিদা পূরণের একটি ভালো উৎস পেয়াজ। এই উপাদানগুলোই পেয়াজে অনেক বেশি পরিমাণে থাকে।প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে।ডায়েটারি ফাইবার থাকে অনেক বেশি যা প্রায় ১২%। পেয়াজে মধ্যে কোন ফ্যাট নাই।এছাড়া পেঁয়াজে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, বি এবং আয়রন পাওয়া যায়।এর জন্য আমাদের রান্নাটাও অনেক বেশি মজা হ য়। বেশি তাপমাত্রায় রান্না করলে পেঁয়াজে থাকা ভিটামিন নষ্ট হয়, তবে অন্যান্য উপাদান অবিকৃত থাকে।

‘রাজনৈতিক মশলা’ পেঁয়াজ


স্বাধীনতাপরবতীর্ বঙ্গবন্ধু সরকারকে নুনের বাজার নিয়ে নাকাল হতে হয় । এর পরের সব সরকারই কমবেশি পেঁয়াজের উ”চমূল্য নিয়ে বিব্রত হয়েছে। প্রতিবেশি ভারতে পেঁয়াজ নিয়ে রাজনীতি অনেক বেশি। জরুরি আইন জারির কারণে ক্ষমতাচ্যুত ইন্দিরা গান্ধী এক বছরের মাথায় ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফিরেন পেঁয়াজের বল্গাহীন বাজারমূল্যকে পুঁজি করে। সূষমা স্বরাজ দিল্লীর মূখ্যমন্ত্রী হিসাবে ফিরতে না পারার জন্য ‘পেঁয়াজ রাজনীতি’কে দায়ি করেন অনেকে। এছাড়া ভারতের অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তির উত্থান-পতনের সঙ্গে পেঁয়াজ জড়িত। এ কথা মাথায় রেখে অতিবৃষ্টি ও বণ্যায় পেঁয়াজ নষ্ট হলে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারত রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এর ধাক্কা পড়ে বাংলাদেশের বাজারে।

কমতে শুরু করেছে পেঁয়াজের দাম


বিকল্প আমদানি ও নতুন পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করায় দাম কমতে শুরু করেছে। মধ্যবিত্ত মানসিকতা, ক্রেতারের হাহাকার, মিডিয়ার অতি প্রচার, আড়তদারদের মজুদ – যুক্তিহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণ বলে মনে করছেন অভিজ্ঞজনরা। তবে সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার দূর্বলতাও চোখ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

করণীয় কী !
দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ফাঁরাক অনতিক্রম্য নয় – মাত্র ছয় লাখ মেট্রিক টন। বারোমাসি পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধি,কৃষকদের পেঁয়াজ উৎপাদনে উৎসাহ প্রদান, কোল্ড স্টোরেজে আলুর পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যব¯’া করা ও হিঙ উৎপাদনের মাধ্যমে পেঁয়াজের উপর চাপ কমানোর মধ্যদিয়ে পেঁয়াজের পরনির্ভরশীলতা দুই বছরের মধ্যেই কাটানো সম্ভব বলে কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা মত দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *