কড়ানজর
  • May 11, 2021
  • Last Update May 7, 2021 8:34 pm
  • গাজীপুর

পিলখানা হত্যা মামলার আদ্যোপান্ত—– কিলিং মিশন নিয়ে জওয়ানরা ছিলেন অন্ধকারে

পিলখানা হত্যা মামলার আদ্যোপান্ত—– কিলিং মিশন নিয়ে জওয়ানরা ছিলেন অন্ধকারে

কড়া নজর প্রতিবেদন ঃ
বিডিআর বিদ্রোহ শুধু ‘ডাল-ভাত’ কর্মসূচির অনিয়মে ক্ষুব্ধতার বহিঃপ্রকাশ ! এই গোস্বা থেকে দীর্ঘ সময় নিয়ে খুঁজে খুঁজে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হত্যা ও তাদের পরিবারের প্রতি নির্দয় পাশবিকতা প্রদর্শন করা যায় ! কম বয়সী এই জওয়ানরা কী তাদের এই কর্মকান্ডে পরিণতি জানত না ! এ সব প্রশ্নের উত্তর আজো মিলেনি।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, বিদ্রোহের আগে যে চার দফা বৈঠক হয় সেখানে হত্যাকান্ডের ব্লু-প্রিন্ট খোলাসা করা হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল ‘জওয়ানরা অফিসারদের ওপর চাপ সৃষ্টি (প্রয়োজনে জিম্মি) করে দাবি আদায় করবে’। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ সকালেই দরবার হলে ভিন্ন চিত্র। অধিকাংশ জওয়ান হতবাক হলেও করার কিছুই ছিল না।
সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে সিপাহি মুহিত বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদকে গুলি করে হত্যা করে। অন্য এক সিপাহি মহাপরিচালককে সামনাসামনি গুলি করতে গিয়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। পরে মুহিত এগিয়ে যায়।
ওবায়দুল হত্যা করেন বিডিআরের তৎকালীন মহাপরিচালকের স্ত্রী নাজনিন শাকিলকে। সিপাহি মাসুম হত্যা করেন মেজর মমিনকে। সিপাহি শামীম আল মামুন, সিপাহি উত্তম বড়ুয়া, তরিকুল ও মোজাম্মেল হত্যা করেন ডা. মেজর মামুনকে। সুবেদার মেজর গোফরান মল্লিকের নেতৃত্বে কয়েকজন খুনি ২৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল লুৎফর রহমান ছাড়াও আরো কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেন। হাবিলদার ইউসুফ ও জালালের গুলিতে নিহত হন ৩৬ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার (সিও) লে. কর্নেল এনায়েত।
সূত্র মতে, খুনিসহ গুরুতর অপরাধে সবচেয়ে বেশি জড়িত ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। দ্বিতীয় অবস্থানে ২৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সদস্য। সিআইডি সূত্র মতে, বিডিআর বিদ্রোহের আগে জওয়ানরা বিভিন্ন দফায় পরিকল্পনা বৈঠকে অংশ নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিডিআর বিদ্রোহের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে ডিএডি তৌহিদের নাম এসেছে। বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ডে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন পিন্টু এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীর ইন্ধন জোগানোর প্রমাণ মিলে। তদন্তে ওঠে আসে হত্যাযজ্ঞে সরাসরি ৬০ জন সম্পৃক্ত। বিদ্রোহের পরিকল্পনা, হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন, হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত ডিএডি তৌহিদ, ডিএডি হাবিব, ডিএডি লতিফ, ডিএডি জলিল, ডিএডি রহিম, হাবিলদার শাহজাহান, হাবিলদার বেলায়েত হোসেন, হাবিলদার জালাল, সুবেদার মেজর গোফরান মল্লিক, ল্যান্স নায়েক সাইদুর, লুৎফর রহমান, জাকারিয়া, ওবায়েদ, সিপাহি সেলিম রেজা, আলতাফ, তারেক, আইয়ুব, কাজল, মাইনুদ্দিন, রেজাউল, জসিম মল্লিক, আজিম পাটোয়ারী, শরিফুল, সোহরাব, সিপাহি তোফাজ্জল, রুবেল, হাবিব মাসুম, সাহাবুদ্দিন, সাহাদত প্রমুখ।
বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রয়ারি সকালে কথিত দাবি দাওয়া আদায়ের নামে নির্বিচারে উর্ধŸতন সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার পরিসমাপ্তি ঘটে ২৬ ফেব্রæয়ারি বিকেলে। দেশ হারায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তা, একজন সৈনিকসহ ৭৪ জনকে। তাদের মধ্যে ১০ জন বিডিআর সদস্য। ছয় জন সাধারণ নাগরিক। এই দু’দিনের বিদ্রোহে অনেক কর্মকর্তার পরিবার সম্ভ্রম হারান। লুটপাট হয় অস্ত্রশস্ত্র, বাসাবাড়ি, টাকা-পয়সা-স্বর্ণালংকার। ঘটে লাশগুম, ম্যানহোলে ফেলে দেয়াসহ অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে সময় লেগেছে ৫শ’ দিন। ইতিহাসের ঘৃণ্যতম বড় ঘটনায় ঢাকার সিএমএম একেএম এনামুল হকের আদালতে অভিযোগপত্র (নং ১২৭) দাখিল করে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। চার্জশিটে ৮২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২১ বিডিআর জওয়ান পলাতক এবং ২১ জন সাধারণ নাগরিক। চার্জশিটে ভিআইপি ১৫ সহ রয়েছেন ১২৮৫ সাক্ষী। অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে ১৫০৪ জনকে। তাদের মধ্যে ১৭ জন সাধারণ নাগরিক। বিদ্রোহের ঘটনায় সিআইডি জঙ্গি, রাজনৈতিক দল ও বাইরের কোন শক্তির ইন্ধন খুঁজে পায়নি। এই ৫০০ দিনের তদন্তে কাজ করেছে পুলিশের দু’ শতাধিক সদস্য। সিএমএম আদালতে পিলখানা হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের পূর্বে সিআইডির সদর দপ্তরের দোতলায় এক প্রেসব্রিফিং এর আয়োজন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি’র বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিআইডির ডিআইজি সাইফুল আলম, সিনিয়র এএসপি ফজলুল কবির ও মামলা পরিচালনায় নিযুক্ত সরকার পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘পিলখানা হত্যা মামলাটি তদন্তের জন্য ৫শ দিন সময় লেগেছে। সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। তদন্তে দু’শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন। আমেরিকার এফবিআই ও বৃটেনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের মতামত নেয়া হয়েছে তদন্তের কাজে। আকন্দ বলেন, তদন্তে ৫ শ’ দিন সময় লাগলেও এত বড় একটি ঘটনার জন্য বেশি সময় বলে মনে হচ্ছে না। আমরা চেষ্টা করেছি যত দ্রত সম্ভব তদন্ত শেষ করার জন্য।
চার্জশিটের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে কাহার আকন্দ জানান, এই মামলায় ২ হাজার ৩০৭ জন আসামির মধ্যে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮০১ জন বিডিআর জওয়ান। বাকি ২৩ জন বাইরের জনসাধারণ। ৮২৪ আসামির মধ্যে ২১ বিডিআর জওয়ান পলাতক। বাকিরা গ্রেপ্তার হয়ে বিভিন্ন কারাগারে বন্দি। তিনি জানান, এ মামলায় ১২৮৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সেনা কর্মকর্তা ১০৬ জন, ভিকটিম পরিবারের ৬৮ জন, বিডিআরের সদস্য ১৮২ জন, সাংবাদিক ১৫ জন, পাবলিক ১১০ জন, আগ্নেয়াস্ত্র ও মোবাইল বিশারদ সাক্ষী ৫ জন, পুলিশ সদস্য ২০২ জন, ফায়ার সার্ভিসের ১০ জন, রেড ক্রিসেন্টের ৩ জন, র‌্যাবের ২৭ জন। ১০৬ জন বিডিআর সদস্যকে সাক্ষ্য নেয়ার কাজে লাগানো হয়। একজন ম্যাজিস্ট্রেট টিআই প্যারেড করান আসামিদের। ৩২ জন ম্যাজিস্ট্রেট ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করেন। ৩৭ জন ডাক্তার সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন। স্কেচ ম্যাপ সাক্ষী ৩ জন, মন্ত্রী এমপি, তিন বাহিনী প্রধান, পুলিশ ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানসহ ভিআইপি সাক্ষী ১৫ জন। দু’জন আইনজীবী এই মামলার তদন্তে আইনি সহায়তা প্রদান করেন। তারা হচ্ছেন এডভোকেট আনিসুল হক ও এডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল। বিদ্রোহের ঘটনা সম্পর্কে তদন্তে যে বিষয়টি উঠে এসেছে তার ব্যাখ্যা দিয়ে সিআইডি কর্মকর্তা আবদুল কাহার বলেন, কথিত দাবি দাওয়া আদায়ের নামে বিডিআর জওয়ানরা উচ্ছৃংখল হয়েই আক্রমণ চালায়। এর আগে তারা বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফা মিটিং করে। বিদ্রোহের প্রথমেই তারা পিলখানায় কোথ (অস্ত্রাগার) ভেঙ্গে অস্ত্র আনে। তারপর দরবার হলে আক্রমণ করে। এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যাকান্ডে মেতে ওঠে। নিহতদের লাশগুলো মাটি চাপা দেয়। প্রথমে এসব লাশ পোড়ানোর সিদ্ধান্ত ছিল। পরে তারা এ সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে এসে গণকবর দেয়। কিছু কিছু লাশ ম্যানহোলে ফেলে দেয়। পরে তা উদ্ধার করা হয়। তিনি জানান, বিদ্রোহের সময় বিডিআর জওয়ানরা লুটতরাজ চালিয়েছে। তারা এ সময় টাকা-পয়সা, অলংকারসহ নিহতদের মোবাইল ফোন লুট করেছে। লুট করা এসব মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই তদন্তে আসামিদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই তদন্তে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, পৃথিবীর মধ্যে জঘন্যতম এবং এতো বেশি সংখ্যক আসামি আর কোন মামলায় হয়েছে বলে জানা নেই। তিনি জানান, পিলখানা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র নম্বর ১২৭। বিস্ফোরক আইনে আরও একটি চর্জাশীট দেয়া হবে আসামিদের বিরুদ্ধে। তিনি দাবি করেন, তদন্তে আমরা সন্তুষ্ট। আশা করি জড়িতদের উপযুক্ত সাজা হবে। পিলখানা ঘটনার মোটিভ কী ছিল ! এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল কাহহার জানান, তাদের দাবি দাওয়া নিয়েই বিদ্রোহ করে বিডিআর জওয়ানরা। ১৯৯১ সালেও এমন একটি বিদ্রোহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সে সময় তারা সফল হতে পারেনি। গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তারা পুণরায় সফল হওয়ার চেষ্টা চালায়। কিন্তু তারা অঘটন ঘটানো ছাড়া সফল হতে পারেনি। তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের পরিকল্পনা ছিল সেনা কর্মকর্তাদেরকে জিম্মি করে দাবি আদায় করবে। আর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হত্যাকান্ড নিয়ে তদন্ত করেছি। রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজা বা রাজনৈতিক কোন ঘটনা কি-না তা নিয়ে তদন্ত করেছি আমরা। এক প্রশ্নের জবাবে কাহার আকন্দ বলেন, বিদ্রোহে রাইফেলস সিকিউরিটি ইউনিটের (আরএসইউ) সদস্যরা জড়িত ছিল। বিদ্রোহে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিডিআর বিদ্রোহ ও পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যও নিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনে এই বক্তব্য পর্ব ছিল কয়েক দফায়। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য রেকর্ড করেছে সিআইডি। বিডিআর বিদ্রোহের পর ১৪ জন বিদ্রোহী জওয়ান ডিএডি তৌহিদের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন বাস ভবন যমুনায় সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় তারা কে কি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য ও দাবি দাওয়ার প্রেক্ষিতে কি বলেছেন, কি নির্দেশ প্রদান করেছেন তা জানার জন্যই সিআইডি বক্তব্য নেন। তবে তাঁকে স্বাক্ষী করা হয়নি অভিযোগপত্রে। ১২৮৫ জন স্বাক্ষীর মধ্যে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিআইপি) স্বাক্ষী হয়েছেন ১৫ জন। তাদের মধ্যে আছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এডভোকেট সাহারা খাতুন, আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, জাতীয় সংসদের হুইপ মির্জা আজম, এমপি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, সাবেক সেনা প্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ, বিমান ও নৌ বাহিনীর প্রধানদ্বয়, পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ, র‌্যাবের ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকারসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানগণ।
পিলখানা হত্যা মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি যে সব নথিপত্র তৈরি করেছে তা রাখা হয়েছে মালিবাগ সিআইডি অফিসের দোতলার সভাকক্ষের ৪টি আলমারিতে। এই নথিপত্রের মধ্যে রয়েছে আসামিদের তালিকা, তাদের জবানবন্দি, স্বাক্ষীদের জবানবন্দি, কেস ডায়েরি, জব্দ তালিকা, চার্ট অব এভিডেন্স, মামলার আলামতসহ অন্যান্য কাগজপত্র।
পাবলিক প্রসিকিউটরের বক্তব্য : পিলখানা হত্যা মামলার পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজল গতকাল বলেন, উদয়াস্ত পরিশ্রম করে অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়েছে। আদালত এটি যথা নিয়মে গ্রহণ করলে আগামী এক মাসের মধ্যেই পিলখানা হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। তিনি জানান, এই মামলাটি দ্রæত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার কাজ সম্পন্ন করা হবে। তবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে প্রতিটি মামলাই ছুটিবিহীন ১৩৫ কার্যদিবসে নিস্পত্তির আইনগত বিধান রয়েছে। সেক্ষেত্রে পিলখানা হত্যার মামলাটিতে আসামি, স্বাক্ষী ও মামলাটির পরিধি বিবেচনা করে দ্রæত বিচার ট্রাইব্যুনালের আইনের সংশোধন করতে হবে। এই মামলাটি নিস্পত্তির ক্ষেত্রে ১৩৫ কার্যদিবসের বাধ্যবাধকতা থেকে বাড়িয়ে তা ৩৬৫ কার্যদিবসের মধ্যে স্থির করতে হবে। ছুটিবিহীন ৩৬৫ দিবসে টানা পরিচালনা করা হলে পিলখানা হত্যা মামলাটির রায় ৩৬৫ দিনের মধ্যেই দেয়া সম্ভব। তিনি দ্রæত বিচার ট্রাইব্যুনালের আইনের সংশোধনীর পক্ষে সুপারিশ করেন। এ জন্য বিশেষ প্রস্তাবনাও সরকারকে দেয়া হবে বলে জানান। দাখিলকৃত চার্জশিটে মোট আসামি ৮২৪ জন। চার্জশিটে অভিযুক্ত খুনিদের অনেকেই বিদ্রোহ ও পরবর্তীকালে হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করার পাশাপাশি তাদের কেউ কেউ লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ করেছেন। হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলা থেকে ১৫০৪ জওয়ান অব্যাহতি পাচ্ছেন। চার্জশিটে পরিকল্পনাকারী হিসেবে পলাতক ২৩ জওয়ানসহ ৫০ জনের নাম থাকছে। মামলায় ৩ হাজার ১৭০ আলামত সংগ্রহ করা হয়। ৭ হাজার ৯৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২ হাজার ৩০৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ৫৩৯ জন। বিডিআর বিদ্রোহে ব্যবহৃত অস্ত্রের ব্যালাস্টিক (অস্ত্রের রাসায়নিক পরীক্ষা) পরীক্ষা করে ২৫০০টি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার তথ্য মিলেছে। তবে কী পরিমাণ গুলী ব্যবহার করা হয়েছে তার হিসাব মেলানো সম্ভব হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনের পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫ হাজার। এতে মামলার বিভিন্ন আলামত সংযুক্ত করা হয়েছে। দেশের যে কোনো মামলার চেয়ে বড় চার্জশিট এই হত্যা মামলার প্রতিবেদন। এর আগে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ৫৪৮ পৃষ্ঠার চার্জশিট ছিল দেশের সবচেয়ে বড় তদন্ত প্রতিবেদন। সিআইডির অভিযোগপত্রে বলা হয়, বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য জওয়ানরা চারবার গোপনভাবে শলাপরামর্শ করেন। বিদ্রোহের আগে তারা মোট চারবার বৈঠকে বসেন। বৈঠকে অংশ নেয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলী ও তার ছেলে লেদার লিটনকে আসামি করা হয়। এ মামলায় অপরাধীদের উস্কানি দান ও পলাতে সহায়তা করায় বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুকে আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, সবচেয়ে জরুরী বৈঠক হয় ২৪ ফেব্রæয়ারি রাতে। ১৬ ফেব্রæয়ারি অনুষ্ঠিত হয় প্রথম পরিকল্পনা বৈঠক। বিদ্রোহীদের চারটি বৈঠকের তিনটিই হয়েছে বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানার বাইরে। বিদ্রোহীদের পরিকল্পনা বৈঠকে যারা অংশ নেয়, কেবল তারাই নয়, বিদ্রোহের শুরুর পর অনেকে হত্যাসহ অনেক গুরুতর অপরাধ ঘটিয়েছে, যারা পরিকল্পনা বৈঠকে উপস্থিত ছিল না। সূত্র মতে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিডিআর জওয়ান ছাড়াও মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বিডিআর কর্মকর্তা, পুলিশ, সেনাসদস্যসহ ৭ হাজার ৯৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সাক্ষী করা হয়েছে প্রায় ১২৮৫ জনকে। প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রæয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। পিলখানা বিদ্রোহের ঘটনা তদন্ত সিআইডির পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আনিস-উজ-জামানের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ছাড়া লে. জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি তদন্ত আদালত গঠন করে সেনাবাহিনী। সূত্র মতে, পিলখানা হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় গত বছরের ৪ মার্চ লালবাগ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। একই বছরের ৬ এপ্রিল মামলাটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর করা হয়। ডিএডি ও সুবেদার ও সুবেদার মেজর পদমর্যাদার কয়েকজন বিডিআর জওয়ান বিদ্রোহের সমন্বয় করেছেন। তবে কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী ৬০ জওয়ানের বেশির ভাগই বয়সে নবীন। সূত্র মতে, চার্জশীটে বলা হয়, পিলখানা ঘটনায় একক কোনো ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় রাজনৈতিক দলের জড়িত থাকারও প্রমাণ মেলেনি। বিডিআর সদস্যদের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ও নানা দাবি-দাওয়া থেকেই এ বিদ্রোহের সূচনা বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়। মামলার তদন্ত সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে বিডিআর জওয়ানরা জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে জওয়ানদের দাবি-দাওয়ার বিষয় বিডিআর কর্তৃপক্ষ আমলে আনেনি। বিডিআর সদস্যরা চেয়েছিলেন, সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে অফিসার নিয়োগ করা হোক। অন্য দিকে বিদেশ মিশনে যাওয়া ও ডাল-ভাত কর্মসূচি নিয়েও তাদের মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এদিকে জওয়ানরা বিদ্রোহের আগে ও পরে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও বিদ্রোহের সঙ্গে তাদের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আগে থেকেই বিদ্রোহীরা সেনা সদস্যের খুনের পরিকল্পনা করেছিল, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিদ্রোহ শুরুর পরই তারা হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। জওয়ানদের সমর্থন জানিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি হাজারীবাগ এলাকায় যে মিছিল বের করা হয়, তাও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, সেনা সদস্যদের হত্যার পর ৪৭ জওয়ান গণকবর খোঁড়া ও লাশবহন করে গণকবরে নেয়ার কাজ করেছে। এ কাজে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে তারা হচ্ছেন- নায়েক সুবেদার মনোরঞ্জন, হাবিলদার জাকির, সুবেদার ইউসুফ, সুবেদার মোস্তফা, হাবিলদার জালাল প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *