কড়ানজর
  • July 26, 2021
  • Last Update July 25, 2021 9:04 pm
  • গাজীপুর

নতুন সূত্রে জটিল হল মানুষের বিবর্তন-ধাঁধা

বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষের বিবর্তন রহস্য নিয়ে গবেষণা চলছে দীর্ঘদিন। খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে প্রতিটি পর্যায়। বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে জিন-বদল। কিন্তু রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া তো দূরস্ত, বরং নতুন সূত্রে আরও জটিল হল বিবর্তনের ধাঁধাঁ। নয়া গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার’ পত্রিকায়।
বেশ কয়েক বছর আগে স্পেনের একটি অঞ্চলে পাহাড়ের গুহার মধ্যে প্রাগৈতিহাসিক মানুষের হাড় খুঁজে পেয়েছিলেন গবেষকরা। সে হাড়ের গঠন বিশ্লেষণ করে তাঁদের ধারণা হয়, হাড়টি নিয়ানডারথ্যালের পূর্বসুরির।

মানব প্রজাতির বিবর্তন।


এর পর পরীক্ষা করে দেখা হয় ডিএনএ-র গঠন। তা দেখে আরও তাজ্জব বনে যান গবেষকরা। ডিএনএ-র গঠনের সঙ্গে অদ্ভুত মিল রয়েছে ডেনিসোভানসদের। আদিম মানুষ ডেনিসোভানসরা পৃথিবীতে রাজত্ব করত ৮০ হাজার বছর আগে। তার আগে আর মনুষ্য বিবর্তনের এ পর্যায়ের প্রমাণ মেলেনি।
বিস্ময়ের তখনও বাকি ছিল। এ বার রেডিও কার্বন ডেটিং করেন বিজ্ঞানীরা। দেখেন আদিম হাড়টির বয়স প্রায় ৪ লক্ষ বছর। সে কী করে হয়? ওই হাড় থেকে যে ডিএনএ নমুনা মিলেছে, তা ডেনিসোভানসদের। এখনও পর্যন্ত জানা তথ্য অনুযায়ী, ৪ লক্ষ বছর আগে ডেনিসোভানসদের অস্তিত্বই ছিল না। নিয়ানডারথ্যালের মতো দেখতেও ছিল না তারা। তা হলে ৪ লক্ষ বছর আগের নিয়ানডারথ্যালের মতো দেখতে ডেনিসোভানসের ওই হাড়টি মানুষের বিবর্তনের কোন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে!
একই দেহাংশের শারীরিক গঠন আর জিনের অন্তর্দ্বন্দ্বে ঘোর সমস্যায় পড়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিগত বছরে মানুষের বিবর্তন রহস্যকে যে ভাবে ধাপে ধাপে খাড়া করিয়েছেন দুনিয়াজোড়া তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা, তার ভিতই তো নড়িয়ে দিয়েছে নতুন তথ্যপ্রমাণ। সব দেখেশুনে বিজ্ঞানীরা বলছেন, সম্ভবত এমন কিছু অবলুপ্ত মনুষ্য জনগোষ্ঠী এক সময় পৃথিবীতে রাজত্ব করত, যাদের কথা আধুনিক মানুষ জানেই না। গবেষকদের মধ্যে অন্যতম ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ইভলিউশনারি অ্যানথ্রোপলজি-র জিন বিশেষজ্ঞ ম্যাথিয়াস মেয়ার যেমন বলছেন, “আমরা শুধু একটা বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছি।” উত্তর জানা নেই।
ধাঁধাঁর শুরু বেশ কয়েক বছর আগে। স্পেনের এক গুহায় সন্ধান মেলে ৪ লক্ষ বছরের পুরনো ‘বিতর্কিত’ ওই হাড়টির। লোকমুখে স্পেনের ওই অঞ্চলটি ‘দ্য পিট অব বোনস’ বা ‘হাড়ের খনি’ নামে পরিচিত। হাজার হাজার বছরের ইতিহাস সম্বলিত গুহাটির প্রথম খোঁজ মিলেছিল ১৯৭০ সালে। বহু জীবাশ্ম উদ্ধার করা হয়েছে সেখান থেকে। মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের হুয়ান লুই আরসুয়াগা বললেন, “জায়গাটা খুব স্পেশ্যাল।” এই গবেষণার পুরোভাগে রয়েছেন তিনি। গত তিন দশক ধরে খননকাজ চালিয়ে, স্পেনের ওই হাড়ের খনিতে ২৮টি আদিম মানুষের প্রায় সম্পূর্ণ কঙ্কাল-জীবাশ্ম উদ্ধার করেছিলেন হুয়ান। বিতর্কিত হাড়টির গঠন পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ২ লক্ষ থেকে ৩০ হাজার বছর আগে নিয়ানডারথ্যালের পূর্বসুরিরা পশ্চিম এশিয়া ও ইউরোপে বাস করত। হাড়গুলি তাদেরই।
গবেষণার পরের ধাপটা ছিল অধ্যাপক মেয়ার ও তাঁর সহযোগীদের হাতে। পায়ের থাইয়ের ওই হাড়টি খুঁড়ে অতি আধুনিক পদ্ধতির সাহায্যে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন। “আমরা ভেবেছিলাম নিয়ানডারথ্যাল পর্যায়েরও গোড়ার দিকের হবে নমুনাটি”, বললেন মেয়ার। কিন্তু তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেন, নিয়ানডারথ্যালের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে মিল খাচ্ছে না এর ডিএনএ। তার পর তাঁরা ডেনিসোভানসদের সঙ্গে মেলাতে গিয়ে দেখেন, ডিএনএ-র গঠন এক্কেবারে একই রকম। মেয়ার বলেন “প্রথমটা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। আমরা তাই আরও তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে শুরু করি।” কিন্তু প্রতিবারেই একই উত্তর। বরং হাড়টি যে মানুষের বিবর্তনপঞ্জীর ডেনিসোভানস শাখারই নমুনা, সে সিদ্ধান্ত আরও জোরদার করল পরের পর পরীক্ষা।
হুয়ান-মেয়াররা জানাচ্ছেন, পুরনোর সঙ্গে নতুন তথ্য মেলানো খুব কষ্টকর হয়ে উঠেছে। হুয়ান যেমন বলছেন, “গল্পটা গোড়া থেকে ভাবতে হবে।” তাই সব মিলিয়ে নয়া তথ্য নিয়ে গবেষকরা এখন বিবর্তন ধাঁধাঁর বিশ বাঁও জলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *