কড়ানজর
  • June 23, 2021
  • Last Update June 23, 2021 12:22 am
  • গাজীপুর

জিয়ার বিরুদ্ধে ক্যু অনিবার্য ছিল!

কড়ানজর প্রতিবেদক:

সামরিক শাসক থেকে দল গঠন করে রাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হওয়া জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর চরম অসন্তোষ ছিল শেষ দুই বছরে। জিয়ার শুভাকাঙ্খী ও সিনিয়র মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা যে কোন সময় একটি অভ্যুত্থানের আশঙ্কা করছিলেন। জিয়াউর রহমানও অভ্যুত্থান-চেষ্টার বিষয়ে অবগত ছিলেন। অবশেষে ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ভোররাতে একদল সেনা সদস্যের হাতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন । ঘটনার আগের দিন তিনি চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের বিরোধ মেটাতে। চট্টগ্রামে বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত বিএনপি নেতাদের সাথে বৈঠক শেষে ২৯শে মে রাতে স্থানীয় সার্কিট হাউজে ঘুমিয়ে ছিলেন জিয়াউর রহমান।
ঘটনার পর ৩০শে মে সকালে সার্কিট হাউজে গিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম রেজা। রেজা বলছিলেন তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সার্কিট হাউজে পাঠানো হয়েছিল সেখানে আগে থেকে অবস্থান নিয়ে থাকা সৈন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেবার জন্য।
(অভ্যুত্থাপনে সক্রিংয়) ‘কর্নেল মতিউর রহমান আমাকে ডাকেন। ডেকে বলেন যে জিয়াউর রহমান ডেডবডিটা কিছু ট্রুপস সাথে নিয়ে সার্কিট হাউজ থেকে নিয়ে পাহাড়ের ভেতরে কোথাও কবর দেবার জন্য। আমি তখন তাকে বললাম যে আমাকে অন্য কাজ দেন। তারপর উনি মেজর শওকত আলীকে ডেকে ওই দায়িত্ব দিলেন।’
‘তখন আমাকে ডেকে বললেন যে তুমি এদের সাথে থাক এবং সাথে যাও। গিয়ে সার্কিট হাউজে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যদের নিয়ে আসবে। সার্কিট হাউজে যাবার পর আমি সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠি। উঠে দেখি সিঁড়ি বারান্দায় একটা ডেডবডি কম্বল দিয়ে ঢাকা আছে। পাশে একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার ডেডবডি? সে বলল, এটা রাষ্ট্রপতির। আমি বললাম কম্বলটা খোল। সেটা খোলার পর দেখলাম তাঁর মাথাটা।”
কাছাকাছি দূরত্বেই পড়ে ছিল কর্নেল এহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজের মৃতদেহ।
ঘটনাস্থল থেকে মেজর রেজাউল করিম রেজা চট্টগ্রাম সেনানিবাসে চলে যান । অন্যদিকে মেজর শওকত আলী তার দল নিয়ে জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ কবর দিতে নিয়ে যায়।
মেজর রেজাউল করিম রেজা সার্কিট হাউজ থেকে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ফিরে এসে দেখেছিলেন যুদ্ধের পরিবেশ। মেজর রেজার মতো যেসব সেনা কর্মকর্তা হয়তো ছুটিতে ছিলেন নতুবা অন্য কোন কাজে ছিলেন, তাদের ডেকে এনে বিভিন্ন দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
অবশেষে কবরের সন্ধান ঃ
নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ১লা জুন জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ খুঁজতে বের হয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ। তাঁর সাথে ছিলেন কয়েকজন সিপাহী, একটি ওয়্যারলেস সেট এবং একটি স্ট্রেচার। তারা কাপ্তাই রাস্তার উদ্দেশ্য রওনা হয়েছিলেন। তারা একটি অনুমানের উপর ভিত্তি করে নতুন কবরের সন্ধান করছিলেন। তখন একজন গ্রামবাসী এসে তাদের জিজ্ঞেস করেন যে তারা কী খোঁজ করছেন ? ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ গ্রামবাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সেনাবাহিনীর সৈন্যরা সেখানে কোন ব্যক্তিকে স¤প্রতি দাফন করেছে কি না? তখন সে গ্রামবাসী একটি ছোট পাহাড় দেখিয়ে জানালেন কয়েকদিন আগে সৈন্যরা সেখানে একজনকে কবর দিয়েছে।
তবে সে গ্রামবাসী জানতেন না যে কাকে সেখানে কবর দেয়া হয়েছে। গ্রামবাসীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, হান্নান শাহ সৈন্যদের নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন নতুন মাটিতে চাপা দেয়া একটি কবর। সেখানে মাটি খুঁড়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং আরো দুই সেনা কর্মকর্তার মৃতদেহ দেখতে পান তারা। তখন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ তুলে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আনা হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ ঢাকায় পাঠানো হয়।

মঞ্জুরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব বর্তায় রেজার উপর ঃ
চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তখনকার জিওসি মেজর
জেনারেল এ মঞ্জুর ৩০শে মে সারাদিন কর্মকর্তা ও সৈন্যদের বিভিন্ন ব্যারাকে ঘুরে-ঘুরে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব থাকায় সারাদিন জেনারেল মঞ্জুরের সাথে থাকতে হয়েছেছে মেজর রেজাউল করিম রেজাকে।

আপোষহীন জেনারেল মঞ্জুর; ঘৃণাভরে এরশাদের ফোন প্রত্যাখ্যান ঃ

জেনারেল মঞ্জুর যখন সেনানিবাসের ভেতরে বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন একপর্যায়ে তাঁর কাছে ঢাকা সেনানিবাস থেকে একটি টেলিফোন আসে। টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো যে জেনারেল এরশাদ মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সাথে কথা বলতে চান।
কিন্তু জেনারেল এরশাদের সাথে কথা বলার বিষয়ে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না জেনারেল মঞ্জুর। জেনারেল এরশাদ ফোন করার পর দুইবার সে টেলিফোন রিসিভ করেননি জেনারেল মঞ্জুর। এ সময় জেনারেল মঞ্জুরের সাথে থাকা তার প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর রেজাউল করিম রেজা পুরো ঘটনা কাছ থেকে দেখেছেন।
জনাব রেজা বলছিলেন, ‘আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে একটা ফোন আসল। জেনারেল মঞ্জুর ফোন রিসিভ করলেন। অপর প্রান্ত থেকে বলছে, জেনারেল এরশাদের সাথে কথা বলেন। তখন জেনারেল মঞ্জুর বলেন, আই ক্যান নট টক টু এরশাদ। এ কথা বলে তিনি টেলিফোনটা রেখে দিলেন। আবার টেলিফোন আসল। আবার টেলিফোনে বলা হলো, ফর গড সেক স্যার, ফর গড সেক- ইউ টক টু জেনারেল এরশাদ। জেনারেল মঞ্জুর এমনভাবে ধরেছিলেন টেলিফোনটা আমি ক্লিয়ার শুনতে পাচ্ছিলাম। জেনারেল মঞ্জুর আবার বললেন, আই ক্যান নট টক টু হিম। এ কথা বলে টেলিফোনটা রেখে দিলেন।’
কারণ জিয়ার বিরুদ্ধে মঞ্জুরদের ক্ষোভের প্রধাণ কারণ ছিল এই পাকিস্তান প্রত্যাগতকে ( হু মু এরশাদ) সেনাপ্রধান বানানো। অন্য পাক ফেরতদের গুরুত্বপূর্ণদের পদে আসীন।

মঞ্জুরের সঙ্গে কথা বলার প্রানান্তর চেষ্টা এরশাদের ঃ
‘৭১ থেকে ৮০ সেনাবাহিনীতে যত ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটেছে প্রতিব্রাই খেসারত দিয়েছেল মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা। চক্রান্ত করে তাতের ফাঁসিতে ঝুঁলিয়ে বা কারা প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করে শেষ করে দেওয়া হচ্ছিল। রেজার কাছে মনে হয়েছিল মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ হয়তো ক্ষমতায় যেতে যাচ্ছেন। কিন্তু জেনারেল মঞ্জুর জেনারেল এরশাদকে মেনে নিতে চাননি। বরং জিয়া মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের বাদ দিয়ে এরশাদের মত‘পাকিস্তানফেরত’অফিসারকে

সেনাপ্রধান ঘোষণা করায় মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা জিয়ার উপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। একসময় জিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ জেনারেল মঞ্জুর পাকিস্তান ফেরত অফিসার এরশাদকে সেনাবাহিনীর প্রধান করায় রূষ্ট হন। মঞ্জুর তাঁর অস্বন্তষ্টির কথা গোপনও রাখেননি। বিভিন্ন সময় দরবার সভায় স্পষ্ট উপাস্থাপন করেওন। মঞ্জুর জিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেন বাংলাদেশবিরোধী ইসলামী দল পুনর্বাসন বা কোন রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য বা দেশে পাকিস্তানি ভাবধারার সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক হস্তক্ষেপ করা হয়নি।

শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী ঃ জিয়া মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন
নিহত হওয়ার দুই বছর আছে থেকে জিয়াউর রহমানের চিন্তা-চেতনায় আমূল পরিবর্তন আসে। তিনি তাঁর সঙ্গে থাকা মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদেও ইপর ভরসা কমিয়ে প্রথমে ‘জাগদল’ ও পরে বিএনপি গঠন করেন। ছলছুট নেতা, সাধীণতাবিরোধীদের জেল থেকে করেও গণবাহিনীর ষÐাদের নিয়ে দলভারী করেন। সঙ্গে গণহারে ধর্মীয় রাজনৈতির ধ্বজাধারীদের দলে ও মোর্চায় ঢুকিয়ে নেন। স্বাধীণতাপন্থী সেনাকর্মকর্তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি আঘাত আাসে বাংলাদেশের বিপক্ষে জাতিসংঘে অবস্থান নেওয়া শাহ আজিজুর রহমানকে যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে বসানো হয়।

হত্যার পটভূমি তৈরি করা হয়েছিল অনেক আগে থেকেই
জিয়াউর রহমানের হত্যার পটভূমি তৈরি হয়েছিল কয়েক বছর আছে থেকেই। বিএনপি’র প্রয়াত সিনিয়রর নেতা ও ব্রিগেডিয়ার (অব.) হান্নান শাহ। মৃত্যুর বেশ কয়েকক বছর আগে বিবিসি বাংলার সাথে এক সাক্ষাতকারে মি. শাহ একথা বলেছিলেন।
জিয়াউর রহমান হত্যাকাÐের সময় হান্নান শাহ ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদায় চট্টগ্রাম মিলিটারি একাডেমিতে কর্মরতত ছিলেন। হান্নান শাহ বিবিসিকে বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাÐের বছর দু’য়েক আগে থেকেই সেনাবাহিনীর কতিপয় সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে দ্ব›দ্ব চলছিল। জিয়াউর রহমান এ দ্ব›দ্ব ম্পর্কে জানতেন। সেজন্য দ্ব›েদ্ব লিপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের তিনি পরস্পরের কাছ থেকে বেশ দূরের জায়গাগুলোতে পোস্টিং দিয়ে রেখেছিলেন।

জিয়ার বিরুদ্ধে পাকিস্তানপ্রীতির অভিযোগ ঃ
হান্নান শাহ বলেন, ‘সেনাবাহিনীর একদল অফিসার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কর্মকাÐে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা মনে করছিলেন, যে সব অফিসার এবং সৈনিক মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা ছিলেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, জিয়াউর রহমান তাদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল এবং তাদেরকে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন।’

এ বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ থেকেই একদল সৈনিক এবং কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে হত্যা করেছিল বলে হান্নান শাহ’র ধারণা।
মেজর রেজাউল করিম রেজাও বলছিলেন, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ডেকে নেবার পর কর্নেল
মতিউরের কথায় তার সেটি মনে হয়েছে।
কর্নেল মতিউর তখন মেজর রেজাকে বলেন, ‘রেজা তুমি কোথায় ছিলে? তোমাকে তো সময় মতো পাওয়া যায় না। আমি বললাম, কী হয়েছে? তখন তিনি বললেন, তুমি জানো না? প্রেসিডেন্ট ইজ কিল্ড। এখন আমাদের সব ফ্রিডম ফাইটারদের ইউনাইটেড থাকতে হবে।’

অপরিকল্পিত অভ্যুত্থান এবং চরম খেসারত ঃ
জিয়াউর রহমান হত্যাকাÐের সময় পাকিস্তান প্রত্যাগত হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন । ৩০ মে সকালে এরশাদ জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করেনান। মঞ্জুরের রুচিবোধ এ করতে বাঁধা দিয়েছে। তিনি কিছু বলতে রাজী হননি। সে সময় দেশের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার। তখন মি. সাত্তার দায়িত্ব ৩০শে মে দুপুরের দিকে রেডিও-টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। মঞ্জুরের সাড়া পেলে এরশাদ সামরিক আসন জারি করত, হয়ত ৩০ মে তারিখেই। জেনারেল মঞ্জুর চট্টগ্রাম ছাড়া ঢাকা ডিভিশনের কোন উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। কারণ ক্ষমতারোহন তাঁর কোন উদ্দেশ্য ছিল না।’ তাঁর কাছের কিছু অফিসার হঠকারিতার মাধ্যমে জিয়াকে হত্যা করে তাঁকে কিংকর্তব্যবিমুঢ় পরিস্থিতিতে ফেলেন। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস তাঁর অনুগত একটি বড় অংশ রাষ্ট্রপতি সাত্তারের সরকারের প্রতি সমর্থন দিয়ে বসেন।

#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *