কড়ানজর
  • September 28, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১১ দিন আগে জম্মু-কাশ্মীর ভেঙ্গে দুই রাজ্য,বিক্ষোভ চলছে

সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১১ দিন আগে জম্মু-কাশ্মীর ভেঙ্গে দুই রাজ্য,বিক্ষোভ চলছে

বিবিসি,কাশ্মীরঃ
কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সোমবার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল ও রাজ্য ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। ১১ দিন আগে এই ঘোষণার ‘ডেডলাইন’ সম্পর্কে কাশ্মীরের কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অসন্তোষ দেখা দিলে সামরিক শক্তি মোতায়েনের বিষয়টিও জানানো হয়েছিল।

জম্মু-কাশ্মীরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানতেন, এমন ঘোষণা গতকাল আসতে পারে। এ জন্য গতকাল বেলা দুইটা নাগাদ প্রস্তুতিও নেয় কাশ্মীরের প্রশাসন। সেখানকার সরকারের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, বর্তমান অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারে এমন পদক্ষেপ ‘নজিরবিহীন’।

সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পদক্ষেপ শুরু হয় সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) মোতায়েনের মধ্য দিয়ে। রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৪৩ হাজার সিআরপিএফ জওয়ান মোতায়েন করা হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোয়িং সি-১৭ গেøাব মাস্টার উড়োজাহাজে করে এই জওয়ানদের সারা দেশ থেকে কাশ্মীরে নেওয়া হয়। আইএএফের এক কর্মকর্তা বলেন, যুদ্ধাবস্থায় যেভাবে সেনা মোতায়েন করা হয় সেভাবে ওই জওয়ানদের মোতায়েন করা হয়েছে। শতাধিক উড়োজাহাজে করে এক সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে তাঁদের সেখানে নেওয়া হয়েছে।

রোববার রাতে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। শ্রীনগরের বিভিন্ন স্থানের এই সেবা বন্ধ করা হয় রোববার বেলা ১১টা থেকে। আর মুঠোফোন সেবা বন্ধ করা হয় গতকাল ভোর চারটার দিকে। এ ছাড়া টেলিফোন নেটওয়ার্কও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর কারণ খুব পরিষ্কার। তথ্যের আদান-প্রদান বন্ধ করা এবং সহিংসতা ঠেকানো। তবে নিরাপত্তা বাহিনী যাতে বিপাকে না পড়ে, সেই ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর জন্য স্যাটেলাইট ফোনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করায় পাকিস্তানেও বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল দেশটির লাহোরে নারীরা বিক্ষোভ অংশ নেন।


ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করায় পাকিস্তানেও বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল দেশটির লাহোরে নারীরা বিক্ষোভ অংশ নেন। আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিল ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর। গতকাল সোমবার সেই মর্যাদা বাতিল করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সঙ্গে জম্মু-কাশ্মীরকে ভেঙে দুই ভাগ করারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ একই সঙ্গে বিশেষ মর্যাদা গেল, গেল রাজ্যের মর্যাদাও।


এই বিশেষ মর্যাদা কাশ্মীরের নাগরিকদের জন্য ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ মর্যাদাই ছিল তাদের রক্ষাকবচ। এর কারণে তাদের নিজস্ব আইন ছিল। কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও সহজে সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারত না। এমনকি ভারতের অন্য অঞ্চলের কোনো নাগরিকের ওই এলাকায় গিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ ছিল না। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদের কারণেই এই রক্ষাকবচ পেয়েছিল কাশ্মীর।

যা যা হারালো কাশ্মীরবাসী


রয়র্টার্স , কাশ্মীর ঃ
ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হয় কাশ্মীরের রাজা হরি সিংয়ের হাত ধরে। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর ভারতে অধিভুক্তির ব্যাপারে তিনি একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন। সে সময় বেশ কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। ওই সব শর্তানুসারে ১৯৪৯ সালে ভারতের সংবিধানে ৩৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত হয়। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে, কাশ্মীরের নিজস্ব সংবিধান থাকবে। এ ছাড়া সামরিক, যোগাযোগ এবং পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে হলে রাজ্য সরকারের অনুমোদন লাগবে।


এর অর্থ হলো, আলাদা আইনকানুন দিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের জনগণের নাগরিকত্ব, সম্পদের মালিকানা, মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করা হচ্ছিল এত দিন। এ কারণেই অন্য রাজ্যের অধিবাসীরা সেখানে জমি কিংবা সম্পদ কিনতে পারতেন না। এ ছাড়া ভারতের সংবিধানের যে ভাগে ৩৭০ অনুচ্ছেদ যুক্ত, সেই ভাগে ‘অস্থায়ী, অন্তবর্তী এবং বিশেষ বিধানের’ বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিশেষ বিধানের জন্যই বিশেষ মর্যাদা পেয়েছিল জম্মু-কাশ্মীর।


টাইমস অব ইন্ডিয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়, এই ৩৭০ অনুচ্ছেদের কারণে কেন্দ্রীয় সরকার ৩৬০ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করেও কাশ্মীরে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা জারি করতে পারত না। শুধু বহিঃশত্রæর আক্রমণ ঠেকাতে এবং যুদ্ধাবস্থার কারণে সেখানে জরুরি অবস্থা জারির সুযোগ ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের ফলে সে বাধা কেটে গেল।


এদিকে ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুসারে, কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দা কে হবে, সেটা নির্ধারণ করতেন রাজ্যের আইনপ্রণেতারা। ১৯৫৪ সালে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে সাংবিধানিক আদেশের মধ্য দিয়ে রাজ্য বিধানসভাকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩৭০ অনুচ্ছেদের পথ ধরেই এই অনুচ্ছেদ এসেছে। ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদের কারণেও অন্য কোনো রাজ্যের বাসিন্দা কাশ্মীরের কোনো সম্পদের মালিক হতে পারতেন না। এমনকি রাজ্যের কোনো সরকারি দপ্তরেও অন্য কোনো রাজ্যের অধিবাসীরা চাকরি করতে পারতেন না।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর আশঙ্কা

বিবিসি,কাশ্মীরঃ
ভারত সরকার গতকাল যে ঘোষণা দিয়েছে তার ফলে অন্য রাজ্যের জনসাধারণ এখন কাশ্মীরে গিয়ে সম্পদ কিনতে পারবে এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে। মূলত এই কারণেই ভয় পাচ্ছে কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা। কারণ তারা আশঙ্কা করছে, এই মর্যাদা বাতিলের ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ওই এলাকা এখন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় পরিণত হবে।


কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার পক্ষে ছিলেন না এখানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লা। তিনি চেয়েছিলেন স্থায়ী স্বায়ত্তশাসন। এ জন্য বিধানও তৈরি করেছিলেন তিনি। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর পরামর্শে রাষ্ট্রপতির নির্দেশে ৩৫ (ক) অনুচ্ছেদটি সংবিধানে যুক্ত করা হয়। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে কাশ্মীরের কোনো নারী ওই রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনিও সেখানকার সম্পত্তির অধিকার হারাবেন।


এদিকে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানোর জন্য ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিল কর্তৃপক্ষ। এ জন্য ৬০ জন অতিরিক্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল। তাঁদের ‘ভ্রাম্যমাণ ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রæত গ্রেপ্তার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থায় সহযোগিতার জন্য তাঁদের সেখানে নেওয়া হয়। এ জন্য ছয়টি অস্থায়ী কারাগারও তৈরি করা হয় কাশ্মীরে।


কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত জম্মু-কাশ্মীর কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছার পর অমরনাথ তীর্থযাত্রীরা এবং পর্যটকেরা ওই এলাকা ছেড়ে চলে গেলে সেখানকার হোটেল ও অতিথিশালাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *