কড়ানজর
  • October 20, 2021
  • Last Update October 1, 2021 6:00 pm
  • গাজীপুর

চিকিৎসার সময় দিচ্ছে না দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট

কড়া নজর প্রতিবেদন ঃ
ভাইরাসের চার পাশে থাকা স্পাইক বা কাঁটার প্রোটিনের গঠনের ওপর ভিত্তি করেই টিকা তৈরি করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনটির স্পাইকে দুই ধরনের মিউটেশন হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। একটি মিউটেশন আগের চাইতে বেশি সংক্রামক, অন্যটি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বিভ্রান্ত করে ফেলে। ফলে ভ্যাকসিন নেয়া না-নেয়াতে কোন তফাৎ থাকে না।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা আইসিডিডিআর’বি-র এক গবেষণায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশে শনাক্ত করোনাভাইরাসের ধরনগুলোর মধ্যে এখন ৮১ শতাংশই দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়ান্ট এবং এ ধরনটির আবির্ভাবে বাংলাদেশে ভাইরাস বিস্তারের ক্ষেত্রে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। নতুন উপসর্গ চিকিৎসার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের আইসিইউ বিভাগের কনসালটেন্ট ডাঃ সাজ্জাদ হোসেন বলছেন যে চলতি ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত রোগীদের অবস্থা একটু খারাপ হলে তা দ্রæতই খারাপতর হয়ে যাচ্ছে। ‘আগে আইসিইউতে কোন রোগী এলে বেশিরভাগকেই আমরা ৮/১০ দিনের মধ্যে রিকভারি করে কেবিনে পাঠাতে পেরেছি। কিন্তু এবার সেটি হচ্ছে না। এবার অনেক দীর্ঘ সময় লাগছে এবং আইসিইউ থেকে অনেকে আবার ফিরতেও পারছেন না। মূলত অনেকেরই ফুসফুস দ্রæত সংক্রমিত হচ্ছে এবং রক্ত জমাট বাঁধছে’।
রোগীদের অবস্থার রাতারাতি অবনতি ঃ
বিশেষজ্ঞদের অভিমত প্রথম দফার তুলনায় এবারে রোগীদের একটি বড় অংশের মধ্যে অবস্থার দ্রæত অবনতি হওয়ার একটি প্রবণতা চিকিৎসকরা দেখতে পাচ্ছেন। অনেককে আক্রান্ত হওয়ার ৬/৭ দিনের মধ্যেই উচ্চ মাত্রার অক্সিজেন দিতে হচ্ছে এবং তাও আবার সেটি তুলনামুলক দীর্ঘ সময়-যেমন ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। আগে আইসোলেশনে থাকার সময় চিকিৎসাতেই সুস্থ হয়ে উঠতো বেশিরভাগ রোগী। কিন্তু এখন ফুসফুস খুব দ্রæত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অক্সিজেন লেভেলও আগের তুলনায় দ্রæত কমে যাচ্ছে। আগে সুস্থ হতে সময় লাগতো ৫/৬ দিন। কিন্তু এখন যারা সুস্থ হচ্ছেন তাদের ক্ষেত্রেও আরও বেশি সময় লাগছে। ডাঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘আগের যাদের অক্সিজেন দরকার হতো, তাদের হয়তো দুই লিটার দিয়ে শুরু করে পর্যায়ক্রমে ৫/১০/১৫/২০ লিটার বা প্রয়োজনে হাই-ফ্লো নেজাল অক্সিজেন দেয়া হতো। অবস্থার অবনতি হলে কয়েকটি ধাপে চিকিৎসা দেয়ার পরে আরও অবনতি হলে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হতো। কিন্তু এখন এতো সময়ই পাওয়া যাচ্ছে না’।
নতুন উপসর্গে ব্রেইন ইনফেকশন, হিমোগেøাবিন ঘাটতি ঃ
আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টে নিউরোসাইক্রিয়াটিক সমস্যা বা পাগলামি আচরণের প্রবণতা কিংবা ব্রেইন ইনফেকশন, রক্তের অনুচক্রিকার সাথে হিমোগেøাবিনও কমে যাচ্ছে। হিমোগেøাবিনের কাজই হচ্ছে রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে অক্সিজেন ও নানা পুষ্টি পরিবহন। আগের ভ্যারিয়েন্টে হিমোগেøাবিন কমে যাওয়ার রেকর্ড ছিল না। এটি একটি বড় বিপর্যয়। আগে একজন-থেকে-একজন সংক্রমণই বেশি হতো। কিন্তু এবারে আক্রান্তরা তাদের কাছে থাকা ৩/৪ জনকে এক সাথে সংক্রমিত করছেন। এখন রোগীর ফুসফুস সংক্রমণের পাশাপাশি রক্ত জমাট বেঁধে যাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের অন্যতম করোনা চিকিৎসক ডাঃ ফজলে রাব্বী বলেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্যাটার্ন আগের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন। প্রথম ওয়েভের সময় আক্রান্তদের মধ্যে অনেককে ৭/৮ দিন পার হওয়ার পর অক্সিজেন দিতে হয়েছিলো, কিন্তু এবারে দিতে হচ্ছে আরও আগেই। এছাড়া, আক্রান্তদের অনেকের স্নায়ুতন্ত্রের উপসর্গ আরও প্রকট দেখা যাচ্ছে – বিশেষ করে অনেকের প্রচন্ড মাথা ব্যথা হচ্ছে।
‘এবার নিউরোসাইক্রিয়াটিক সমস্যা, যেমন কারও কারও মধ্যে পাগলামি আচরণের প্রবণতা কিংবা ব্রেইন ইনফেকশনের মতো উপসর্গও দেখা যাচ্ছে’। এখন আক্রান্তদের অবস্থার দ্রæত অবনতির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। অধ্যাপক ফজলে রাব্বী বলেন, এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে যাদের রক্তের অনুচক্রিকার সাথে হিমোগেøাবিনও কমে যাচ্ছে। অথচ গত বছর প্রথম দফার সংক্রমণের সময় অনেকের রক্তের অনুচক্রিকা কমলেও তখন হিমোগেøাবিনের সমস্যা রোগীদের মধ্যে ছিল না।
আর এসব নতুন ধরণের সমস্যার কারণে অবস্থার দ্রæত অবনতি হয়ে অনেককে খুব তাড়াতাড়ি আইসিইউতে নিতে হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের শনাক্ত হওয়ার হার খুব দ্রæত বেড়েছে-প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে শনাক্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুও। আর সেজন্যই ধারণা করা হচ্ছিল যে সংক্রমণের ক্ষেত্রে কোন পরিবর্তন হয়তো হয়েছে।
দুঃসাবাদ আর দুঃসংবাদ ঃ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ জানাচ্ছেন, আগে একবার করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের শরীরে যে প্রাকৃতিক ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় সেটা সাউথ আফ্রিকান ধরনের ক্ষেত্রে কাজ করে না। সেই একই কারণে যারা ভ্যাকসিন নিয়েছেন তাঁরা কোন অবস্থাতেই ‘নিরাপদ’ বলা যাবে না। বাংলাদেশে অক্সফোর্ডের অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেয়া হচ্ছে। এই টিকা আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টে কোন কাজ করবে কী-না সকল বিশেষজ্ঞই সন্দিহান। তবে নতুন দুটি টিকা নোভাভ্যাক্স এবং জানসেন, দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনটি প্রতিরোধে বেশি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধে জোর
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাসিমা সুলতানা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে এখন যে টিকাটি আছে সেটারই সম্পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করার দিকে তারা মনোযোগ দিচ্ছেন। অবশ্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দক্ষিণ আফ্রিকান ধরণটি জিন বিশ্লেষণ করে টিকা দেওয়ার কৌশলের ওপর জোর দিচ্ছেন। নাসিমা সুলতানা বলছেন, প্রতিকারের চেয়ে আমাদের করোনা প্রতিরোধের দিকে জোর দিতে হবে। এজন্য যতদিন করোনা আছে ততদিন স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। এর বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়েছিলো ২০২০ সালের মার্চের শুরুতে এবং তখন চিকিৎসরা এর উপসর্গ হিসেবে জ্বর, শুষ্ক কাশি, শরীর ব্যথার মতো উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। এখন গবেষকরা বলছেন যে বাংলাদেশে বর্তমানে করোভাইরাসের দুটো নতুন ভ্যারিয়ান্ট ছড়িয়েছে এবং এদের মধ্যে ইউকে ভ্যারিয়ান্ট শুরুতে শনাক্ত হলেও এখন সবচেয়ে বেশি প্রকোপ দক্ষিণ আফিকার প্রজাতিটির। রোগীদের চিকিৎসার সাথে সরাসরি জড়িত চিকিৎসকরা বলছেন যে নতুন ভ্যারিয়ান্টে আক্রান্তদের মধ্যে নানা নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাচ্ছেন তারা।
###

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *