কড়ানজর
  • October 20, 2021
  • Last Update October 1, 2021 6:00 pm
  • গাজীপুর

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ইতিহাস যন্ত্রনাদগ্ধ– ৬৮ বছরেরও মূল নকশার বাস্তবায়ন নেই

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ইতিহাস যন্ত্রনাদগ্ধ– ৬৮ বছরেরও মূল নকশার বাস্তবায়ন নেই

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের ইতিহাস যন্ত্রনাদগ্ধ– ৬৮ বছরেরও মূল নকশার বাস্তবায়ন নেই

কড়া নজর প্রতিবেদনঃ-

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পাশে ভাষা শহীদদের স্মরনে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ’র নকশাকারক স্থপতি হামিদুর রহমান। মূল নকশায় স্তম্ভের সামনে- চত্বরের মধ্যস্থলে একটি সরোবর হবে, সরোবরে প্রস্ফুটিত রক্তকমল ; শাপলা। স্তম্ভগুলোর অবনত মাথার ছায়া, স্তম্ভের মধ্যবর্তী ফাঁকে ফাঁকে লোহার শিক, মূল শহীদ বেদির দুই পাশে দুইটি সবুজ কামরা। একটি পাঠাগার, অন্যটি জাদুঘর। মূল চত্বরের বাইরে একটি উঁচু বেদি হবে। এটি সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত। স্থপতির ব্যাখ্যা হচ্ছে – মূলবেদি জন্মভূমি। অবনত মাথা স্তম্ভগুলো এবং পাশেরগুলো জনতা। স্বচ্ছপানি শহীদের আত্মার প্রতিকৃতি। রক্তকমল শাপলা হলো আত্মদানের প্রতীক। সরোবরে অবনত-শিরের ছায়া হচ্ছে শহীদের আত্মদানের প্রতি দেশবাসীর কৃতজ্ঞতা।

বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি আদি নকশার ধারে কাছে নেই। স্তম্ভটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিদের রোষানলে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। স্বাধীনতাপরবর্তী দুই সামরিক সরকার (জিয়া ও এরশাদ) শহীদ মিনারের নকশার উপর আঘাত হানে।

শহীদ মিনারটি যেখানে দাঁড়িয়ে ৫২’র একুশে ফেব্রæয়ারি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনকারীদের ওপর প্রথম সেখানে গুলি চালানো হয়েছিল। এ প্রেক্ষিতে পরদিন (২২ ফেব্রæয়ারি) এখানে তৈরি করা হয়েছিল একটি স্মৃতিস্তম্ভ। ওইদিন সূর্যাস্তের সময় ভাষা আন্দোলনের তৎকালীন নেতা কর্মীদের সিদ্ধান্তানুযায়ী এটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাতে ইট সুরকি সিমেন্টসহ মালামাল জোগার করে সারারাত ধরে অমানুষিক পরিশ্রম করে স্মৃতিসম্ভ শেষ করা হয়। ছাত্রহত্যার প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দেওয়া ‘দৈনিক আজাদ’ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন ২৩ ফেব্রুয়ারি শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে তিনি যুব-ছাত্র-জনতার আস্থাভাজন হন, কিন্তু সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে চুরমার করে দেয় ।

১৯৫৪ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে এককভাবে বিজয়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার তাদের নির্বাচনী ওয়াদা মোতাবেক স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এ প্রেক্ষিতে ১৯৫৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার শহীদ মিনারের ভিত্তিস্থাপন করেন।

১৯৫৬ সালে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর আতাউর রহমান খান শহীদ মিনারের ব্ল-প্রিন্ট ও ডিজাইন তৈরির জন্য প্রখ্যাত স্থপতি হামিদুর রহমানকে নিযুক্ত করেন। শহীদ মিনারের অঙ্গশোভা পরিকল্পনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও শিল্পী কামরুল হাসান। আতাউর রহমান খানের সরকার দুই বছরের বেশি ক্ষমতাসীন ছিলেন-তবুও নকশা মোতাবেক শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব হয়নি। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে উর্দুভাষী গভর্নর লে. জে. আযম খান বর্তমান শহীদ মিনারটি নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ বরকতের মা মিনারটি উদ্বোধন করেন। লে. জে. আযম খান নির্মিত এ শহীদ মিনারটি ছিল স্থপতি হামিদুর রহমান কর্তৃক অঙ্কিত নকশার আংশিক বাস্তবায়ন মাত্র।

৬৬-এর ছাত্র আন্দোলন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মার্চের অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধীনতাপরবর্তী জেনারেল জিয়ার দুঃশাসন, স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রেরণা জুগিয়েছে শহীদ মিনার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর কামানের গোলার আঘাতে শহীদ মিনার ধ্বংস্তুপে পরিণত হয়। শহীদ হন মিনারের প্রহরী দেলোয়ার হোসেন, সালাহ উদ্দীন ও রইছ আলী।

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭২ সালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য একটি পরিষদ গঠিত হয়। একটি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মিনারের জন্য নকশা বাছাই করে এ পরিষদ। প্রতিদ্বন্ধী ১২টি নকশার মধ্যে শিল্পী হামিদুর রহমান এবং জাফরের নকশা শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়। কাজও শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু সরকার এটি শেষ করতে পারেননি। জিয়াউর রহমান মিনারটি নির্মাণের জন্য ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ করেন। কিন্তু কাজটি করা হয়নি।

১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রæয়ারিতে সামরিক শাসক এরশাদ জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে মূল নকশা অনুযায়ী শহীদ মিনার পরিবর্ধনের কথা বলেন। পরের দিনই গণপূর্ত বিভাগ মূল নকশার বিষয়গুলো এড়িয়ে একটি নকশা তৈরি করে। ওই নকশা অনুয়ায়ী ওই বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পুনর্র্নিমাণে কাজ শুরু হয়। ১৯৮৪ সালের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

নবনির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের জমির পরিমাণ প্রায় ৪ একর। মিনারটি ৭০ হাজার বর্গফুট বা ১ দশমিক ৫ একরের চেয়ে কিছু বেশি। ফুল দেয়ার বেদিটির আয়তন ২ হাজার বর্গফুট। টকটকে লাল পাথরের অভাবে ‘রেড অক্সাইড’ দিয়ে লাল করা হয়েছে।

৫২’র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর ৬৮ বছর পেরিয়ে গেলেও নকশা অনুযায়ী পূর্ণতা পায়নি এই শহীদ মিনার। আজও তা রয়ে গেছে অপূর্ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *