কড়ানজর
  • July 27, 2021
  • Last Update July 27, 2021 8:57 pm
  • গাজীপুর

কলকাতা-লন্ডন রুটে বাস চলত ৭০’র দশকেও

কড়া নজর প্রতিবেদন ঃ

৭০ দশকে ভারত-ইংল্যান্ডের মধ্যে চলত একটি বাস

যাকে সবাই একডাকে ‘অ্যালবার্ট’ বলে চিনত

৮৫ পাউন্ডে পাওয়া যেত বিলাশবহুল যাত্রা

খাওয়াদাওয়া, বিনোদন, আড্ডা সব ছিল সেখানে

৭০’র দশকের গোড়াতেও বাংলার কলকাতা থেকে ২০ হাজার ৩০০ মাইল দূরত্বে লন্ডনে বাস চলাচল করত। যার শুরু ৫০’র দশকে। এটাই ছিল পৃথিবীর দীর্ঘতম বাসরুট। অন্তত ১৫ বার লন্ডন থেকে কলকাতা যাতায়াত করেছিল ‘‌অ্যালবার্ট’‌ নামের ডাবল ডেকার বাস। আর চার বার লন্ডন থেকে কলকাতা হয়ে ছুটেছিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনি। বিশ্বাস করতে কঠিন হলেও এটাই সত্যি। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশন থেকে ছাড়ত সেই বাস। কয়েক জন যাত্রীর সেই বাস ধরার ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। তার পরেই সামনে এল সেই পৃথিবীর দীর্ঘতম বাস রুটের ইতিহাস। বর্তমানে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহর থেকে পেরুর রাজধানী লিমা পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কিলোমিটার বাস চলাচলের রুটটিই বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম ।

লন্ডন-কলকাতা-লন্ডন

এই দীর্ঘ রুটে চলাচলকারী ‘অ্যালবার্ট ট্র্যাভেল’ নামের বাস সার্ভিস যাত্রী নিয়ে আসতো যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে ভারতের কলকাতায়। শুনতে অবাক লাগলেও এটিই সত্যি যে, ১৯৫০ এর দশকে লন্ডন-কলকাতা রুটে চালু ছিলো এমনি একটি বাস পরিষেবা। যার মাধ্যমে অভিজাত ব্রিটিশ নাগরিকরা লন্ডন থেকে কলকাতায় আসতেন। বাস দেখতে ছিল যেমন চমৎকার আর ভাড়াটাও নেহাত কম স্মার্ট ছিল না। পাউন্ডের হিসাবে ৮৫। আর তখন ভারতীয় মুদ্রায় ৭,৮৮৯ টাকা (তৎকালীন হিসাব)। বর্তমান টাকার অংকে টিকেটের মূল্য খুবই কম মনে হলেও তখনকার সময়ে এটি বিরাট অংকের অর্থ ছিলো। যাত্রীরা সেই সময় এতটা পরিমাণ অর্থ খরচ করেই এই বাসে জায়গা পেতেন। কলকাতা থেকে লন্ডনের মধ্যে যাতায়াতে সময় লাগত ৪৯ দিন। ১৯৭২ সালের ২৫ জুলাই অ্যালবার্ট কলকাতার উদ্দেশ যাত্রা শুরু করেছিল। কলকাতায় যখন অ্যালবার্ট এসে থামে, সেদিন তারিখটা ছিল ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯৭২। অ্যালবার্ট তার এই যাত্রা পথে ১৫০টি সীমান্ত পার করত। কিন্তু, কোনওদিনই তাকে নিয়ে সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে কোনও বিতর্ক হয়নি। বরং অ্যালবার্ট তারা বিশ্বের দূত হিসাবে পরিচয় দিত।

ঐতিহাসিক বাস রুট

লন্ডন থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে বেলজিয়াম। সেখান থেকে পশ্চিম জার্মানি হয়ে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা। এরপর একে একে যুগো¯েøাভাকিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক হয়ে অ্যালবার্ট প্রবেশ করত ইরানে। সেখান থেকে আফগানিস্তানের ভিতর দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে ভারতীয় ভুখÐে প্রবেশ করত অ্যালবার্ট। ভারতে প্রথম স্টপ ছিল দিল্লি। এরপর আগ্রা। তারপরে ইলাহাবাদ এবং বেনারস। অবশেষে কলকাতায় এসে থামত অ্যালবার্ট। স¤প্রতি অ্যালবাট্রের পরিষেবার একটি ছবি ভাইরাল হয়েছে। যেখানে ভিক্টোরি স্টেশনের সামনে অ্যালবার্টকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

আয়েশি সেই যাত্রা

অভিজাত এ বাস সার্ভিসটির ট্যাগ লাইন ছিলো- ‘ভ্রমণে সম্পূর্ণ বাড়ির স্বাদ’। একটানা যাতে সিটে বসতে না হয় , তাই ভিতরে অ্যালবাট্রের ডাবল ডেকার বডির ভিতরে অনেকটাই হাল ফ্যাশানের ক্যারভ্যানের স্টাইলে গদিওয়ালা লম্বা সিটের পাশেই ছিল বড়-সড় জানালা। চলাচল করার জন্য অনেকটা জায়গা। জুতো ডেবে যাবে, মেঝেতে এমন দামি কার্পেট। ছিল বই পড়ার জায়গা। ছিল খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও। সে জন্য আলাদা খরচ গুণতে হতো না। ছিল আস্ত বড় একটা ডাইনিং রুম। বিনোদনেরও বিপুল আয়োজন করে রেখেছিল ‘অ্যালবার্ট’। রেডিও এবং মিউজিকেরও এলাহি ব্যবস্থা ছিল। বাসের মধ্যে ছিল শরীর গরম রাখার জন্য ফ্যান হিটার। শাটারস্টকের আর্কাইভের একটি ছবিতে দেখা যায়, ১৯৭৫ সালে ২০ জনের মতো ব্রিটিশ নাগরিক লন্ডন থেকে কলকাতায় যাচ্ছিলেন। তারা যাত্রা পথে যুগো¯েøাভাকিয়ার একটি নদীর ধারে পিকনিক করে বাসে উঠছেন।

’৬৮ সনে হাতবদল

অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট নামে এক ব্রিটিশ ১৯৬৮ সালের মে মাসে সিডনিতে বাসটি কিনে নেন এবং বাসের ভিতরে কাঠামোর আমূল পরিবর্তন করেন। অ্যান্ডি কার্যত এই বাসটিকে একটা চলমান লাক্সারি বাড়ির আকার দেন। বাসটি সংস্কারের সময় যাত্রীদের বসার জায়গায় মোট ১৩ লাক্সারি ইউনিট তৈরি করিয়েছিলেন অ্যান্ডি। রুট হিসাবে বেছেথিলেন সিডনি টু কলকাতা এবং তারপর সোজা লন্ডন। হাই রোড ফর অজি-র দাবি অনুযায়ী, ৪,৫,৬, ৭, ৮ এবং নম্বর ট্রিপ ছিল লন্ডন থেকে সিডনি। মাঝে হল্ট বাস স্টপ কলকাতা। দাবি অনুযায়ী, ১২, ১৩,১৪ ও ১৫ নম্বর ট্রিপ হয়েছিল লন্ডন থেকে কলকাতার মধ্যে।

স¤প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সম্পর্কিত একটি ছবি ভাইরাল হয়। প্রথম দেখায় অনেকে ভেবেছিলেন ছবিটি ভুয়া বা ফটোশপের কারসাজি। কিন্তু পরে জানা যায়, লন্ডন-কলকাতা রুটে সত্যিই এমন একটি বাস সার্ভিস চালু ছিল। স¤প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাসটির একটি টিকেটের ছবিও ভাইরাল হয়। যেখানে বাসটি কোন পথে লন্ডন থেকে কলকাতায় আসতো সেই রুটও লেখা রয়েছে।

#

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *