কড়ানজর
  • September 28, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

কথিত ‘শত্রু সম্পত্তি’র সেকাল-একাল

কথিত ‘শত্রু সম্পত্তি’র সেকাল-একাল

কথিত ‘শত্রু সম্পত্তি’র সেকাল-একাল

মোঃ আলফাজ উদ্দিন –
বক্সারের যুদ্ধের পর মোঘল সম্রাট
দ্বিতীয় শাহ আলম অসহায় হয়ে পড়লে পুনরায় ইংরেজদের শরণাপন্ন হন। এলাহাবাদ চুক্তি (১৭৬৫) অনুসারে শাহ আলম বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকার বিনিময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা বা দেওয়ানি প্রদান করেন। রাজস্ব বিভাগ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালের ১৩ আগষ্ট গঠন করেন বোর্ড অব রেভিনিউ ।

The Court of Wards Act, 1879 (Bengal Act, IX of 1879) অনুসারে কোর্ট অব ওয়ার্ডস পরিচালিত হয়। ওই আইনের ৬ (ই) ধারায় ১৯১১-১২ সালে ভাওয়াল রাজাদের জমিদারি কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে আসে। মোঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ বাংলার দেওয়ানি বিক্রয় করার ফলে ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজ এস্টেট চলে যায় ইংরেজদের হাতে । The Court of Wards Act, ১৮৭৯ আইনের ৫ নং ধারায় ওয়ারেন হেস্টিংসের ‘বোর্ড অব রেভিনিউ’ – কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের ব্যবস্থাপনায় আসেন। অনেক চড়াই উতড়াই, বিপ্লব আর রক্তক্ষয়ের মধ্য দিয়ে এদেশ থেকে বৃটিশ বেনিয়ারা চলে যেতে বাধ্য হলেন। কিন্তু প্রজাসাধারণকে নিষ্পেষণের স্টিম রোলার খ্যাত বোর্ড অব রেভিনিউ রয়ে গেলো দেশপ্রেমীদের শায়েস্তা করার লক্ষ্যে। এই বোর্ড অব রেভিনিউের কারসাজিতে তৎকালিন পাকিস্তান সরকার বিরোধী শক্তি ও মতকে পর্যুদস্ত করতে ‘ শত্রু সম্পত্তি’র তালিকা প্রণয়ন করেন। মূল লক্ষ্য অধিকার সচেতন বাঙালি হিন্দু সমাজকে নিজ ভিটায় পরবাসি করা। ফলশ্রতিতে ভিটা থাকলো , ঘর থাকলো কিন্তু মালিকানার অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো। নিজের সম্পত্তি আখ্যা পেলো ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসাবে। হলো কালো তালিকাভুক্ত।

দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম, জানবাজ যুদ্ধ, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তাক্ত -স্রোতধারা পদ্মা-মেঘনা-যমুনার বুকে, ৩ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো । অবশ্য ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত স্বাধীন বাংলা মায়ের বুকে চেঁপে রইল ‘বোর্ড অব রেভিনিউ ’। বিষয়টি ঠিকই উপলব্ধি করলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৩ সালে বোর্ড অব রেভিনিউ বিলুপ্ত করলেন। বাংলার কৃষক সমাজকে স্বাবলম্বী করতে ভুমি ব্যবস্থাপনা সরকারের প্রত্যক্ষ তদারকিতে নিয়ে আসলেন। ১৫ই আগষ্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে এদেশ কৃষক সমাজের জন্য সত্যিকার অর্থে সোনার বাংলা গড়ে উঠতো- এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।

বঙ্গবন্ধু নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর পাকিস্তানি ভাবধারার সাম্প্রদায়িক বৈষম্য ও রাজনীতিতে ধর্মীয় অনুভুতি ব্যবহার পুনরায় শুরু হয়। শত্রæ সম্পত্তি আইন বহাল ,হিন্দু সম্প্রদায়ের জমি কালো তালিকাভুক্ত বহাল থাকল। সম্প্রদায়টি তাদের জমির অধিকার ফিরে পাবার স্বপ্ন হারিয়ে ফেললেন। বন্দুকের নলের মাধ্যমে খোন্দকার মোশতাক ক্ষমতায় আসলেও টিকে থাকতে পারলেন না। সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া খোন্দকার মোশতাকের পথ বেয়ে ক্ষমতায় আসলেন। স্বনির্ভর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বুলি আওড়ালেন কিন্তু ১৯ দফায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তির অধিকারের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকল। বরং অসাংবিধানিক ও বেআইনিভাবে ওই সব সম্পত্তি ‘ লিজ ’ দেয়ার নামে নিজ অনুসারীদের উপঢৌকন দিলেন। জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে ‘ভুমি সংস্কার বোর্ড ’ গঠন করে জমির মালিকদের বানালেন বর্গা চাষী আর অবৈধ দখলদারদের বানালেন জমির মালিক ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *