কড়ানজর
  • March 8, 2021
  • Last Update January 31, 2021 2:56 am
  • গাজীপুর

ইয়াহিয়া পাকিস্তানে কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চেয়েছিল

কড়া নজর প্রতিবেদন :
২৬ ডিসেম্বর’৭২ ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় নিবেদন করেন, ‘আমার ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে শেখ মুজিবকে হত্যা করার অনুমতি দাও। আমার জীবনে যদি কোন ভুল করে থাকি তাহলে তা হচ্ছে শেখ মুজিবকে ফাঁসির কাষ্ঠে না ঝোলানো।’
দশ দিন আগে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করলেও মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনো পাকিস্তানে আটক। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মহুতির বিনিময়ে অর্জিত এ বিজয় পূর্ণতা পাচ্ছিল না। জাতির পিতা শত্রু দেশের কব্জায়। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। বাংলার ঘরে ঘরে রোজা রাখা ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন চলছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিশ^ দরবারে ছুটে বেড়াচ্ছেন ‘শেখ সাহেব’র মুক্তির প্রশ্নে পাকিস্তানের ওপর চাপ বাড়াতে। বিশ্বজুড়ে উৎকন্ঠা বাড়ছিল – কোথায়, কেমন আছে শেখ মুজিব ! পাকিস্তানি শাসকরা কী তাকে মুক্তি দিবে ! বাঙালির কাছে বঙ্গবন্ধুবিহীন বিজয় অসম্পূর্ণ।
মাথা গরম মদ্যপ জেনারেলের কথায় সায় না দিয়ে ভুট্টো বরং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জীবন নিয়ে শঙ্কায় পড়ে গেলেন। কারণ বাংলাদেশে তখন পাকিস্তানের ৯৩ হাজার পরাজিত সৈনিক আটকা। তাই ক্ষমতাগ্রহণের রাতেই মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুকে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন।
মিয়ানওয়ালী কারাগারের প্রিজন ছিলেন হাবিব আলী। ২৬ ডিসেম্বর রাতে বঙ্গবন্ধুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রিজন হাবিব আলী একটি ট্রাক নিয়ে মিয়ানওয়ালী কারাগারে যান। কারা ফটক খুলে দেখেন বঙ্গবন্ধু মুজিব সেলের ভেতর একটি কম্বল জড়িয়ে বিছানার ওপর বসে আছেন। বঙ্গবন্ধু ভাবলেন তাকে হত্যা করার জন্য হাবিব এসেছে। অক্টোবর মাসে সামরিক আদালত বিচারের নামে তাঁর ফাঁসির আদেশ হয়েছিল। আর সেলের সামনে তাঁর জন্য কবর খোঁড়া ছিল। বঙ্গবন্ধু প্রিজন হাবিব আলীসহ কয়েদিদের উদ্দেশ্য করে বললেন ‘মৃত্যুকে আমি ভয় পাই না। আমি জানি তোমরা আমাকে ফাঁসি দেবে। কিন্তু বাংলাদেশ একদিন স্বাধীন হবে। যে বাংলার দামাল ছেলেরা হাসি মুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে, সেই বাঙালি জাতিকে কেউ দাবাইয়া রাখতে পারবে না। বঙ্গবন্ধু প্রিজন হাবিব আলীকে বলেন, ‘আমাকে হত্যা করে মৃতদেহ আমার বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিও। যে বাংলার আলো- বাতাসে আমি বড় হয়েছি। সে বাংলার মাটিতে আমি চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে চাই’।
প্রিজন হাবিব আলী তখন বলেন ‘শেখ সাহেব, আমি আপনার একজন শুভাকাঙ্খী। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমি আপনাকে নিরাপদস্থানে নিয়ে যেতে এসেছি। কারণ এখানে কমান্ডো আসতে পারে। তারা আপনাকে হত্যা করবে। আমার ওপর আপনি আস্থা রাখুন।’
বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ট্রাকে তুলে হাবিব আলী তার ‘চশমা ব্যারাজ’ নামের বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে গিয়ে বঙ্গবন্ধু মুজিব টেলিফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে প্রিজন হাবিব আলী অপারগতা প্রকাশ করে বলেন ‘আমার কাজ আপনার জীবন রক্ষা করা, ঝুঁকিতে ফেলা নয়।’ এ বাড়িতে বঙ্গবন্ধুকে দুই দিন রাখা হয়। পরে বঙ্গবন্ধু মুজিবকে শিহালায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য তৈরি একটি রেস্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়।
ড. কামাল হোসেন যুদ্ধকালীন পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অ্যাবোটাবাদের হরিপুর কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২৮ ডিসেম্বর তাকেও হরিপুর থেকে শিহালা রেস্ট হাউজের এক নম্বর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে শেখ মুজিবুর রহমান গৃহবন্দি ছিলেন । দু’দিন পর শিহালায় ভুট্টোর বার্তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজিজ আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন ।
পরে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে এই শিহালাতে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো মুজিবের সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসেন। শুরুতেই ভুট্টো বলেন, Now I am the President and Chief Martial Law Administrator of Pakistan. তারপর মুজিব বলেন, Mr. Bhotto, Tell me first, whatever I am a freeman or prisoner? উত্তরে ভুট্টো বলেন, Neither you are a prisoner, nor you are a freeman তখন মুজিব বললেন, In that case I will not talk to you. তখন ভুট্টো বাধ্য হয়ে বললেন You are a freeman । এরপর দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়। ভুট্টো প্রস্তাব দিলেন – ‘একটা কনফেডারেশন করে একসঙ্গে থাকা যায় কী-না ’। বঙ্গবন্ধু মুজিব সাফ জানিয়ে দিলেন ‘ দেশে ফিরে সহকর্মী ও জনগনের সঙ্গে কথা না বলে কিছুই বলা সম্ভবপর নয়’। এরপর বঙ্গবন্ধুকে স্বাক্ষর করার জন্য একটা যৌথ ইশতেহার দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু মুজিব সেটাও প্রত্যাখ্যান করেন। শেষে মুজিব বললেন, আমি কি এখন দেশে যেতে পারি ? ভুট্টো বললেন, ‘হ্যাঁ, যেতে পারেন। কিন্তু কিভাবে যাবেন ? ‘পাকিস্তানের চওঅ ভারতের ওপর দিয়ে যায় না’। বঙ্গবন্ধুকে তেহরানের অথবা ইস্তাম্বুলে যাবার প্রস্তাব দেওয়া হয় কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। পরে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
৭ জানুয়ারি আজিজ এসে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গেলেন রাওয়ালপিন্ডি। সেখানে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সম্মানে ডিনারের আয়োজন করলেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানে আসবেন। ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব দিলে শেখ মুজিব অস্বীকৃতি জানান।
৭২’র ৮ জানুয়ারি রাওয়ালপিন্ডির পুলিশ রেস্ট হাউজ থেকে রাত দুইটার দিকে বিশেষ বিমান (৬৩৫ ফ্লাইট) বঙ্গবন্ধু, ড. কামাল হোসেন ও পিআইএ’র তৎকালীন চেয়ারম্যানকে নিয়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে ছাড়ে। ভুট্টো নিজে বিমানবন্দরে এসে বঙ্গবন্ধুকে বিদায় জানান। বলা হল এটা স্ট্যাটিজিক কার্গো হিসাবে ননস্টপ লন্ডনে যাবে। বিমানে শেখ মুজিবুর রহমান আছেন একথা লন্ডন বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষ অবতরণের আধঘন্টা আগে জানতে পারেন। ৯ জানুয়ারি ভোর ছয়টায় বিমানটি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছে । হিথ্রো বিমানবন্দরে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান সাদারল্যান্ড বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে অভ্যর্থনা জানান। সেখানে যথাযথ প্রটোকল প্রদান করা হয়। বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিথের সঙ্গে বৈঠক ও সংবাদ সম্মেলন করেন। সম্মেলনের মাধ্যমে সকল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমর্থন দানের জন্য বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতা জানান। লন্ডন থেকে ঢাকা ফেরার পথে যাত্রা বিরতিতে তিনি দিল্লীতে শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধীর কাছে স্বাধীনতা সংগ্রামে অকুণ্ঠ সমর্থন ও ১ কোটির বেশি শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান। বঙ্গবন্ধু ইন্দিরার কাছে জানতে চান কবে নাগাদ ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে আনা হবে। জবাবে ইন্ধিরা গান্ধী বলেন, স্বাধীন দেশে আপনার জন্মদিন পালনের পূর্বে (১৭ মার্চ ’৭২) সব ভারতীয় সৈন্য চলে আসবে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
১০ জানুয়ারি বিকেলে বুক ভরা আনন্দ আর স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বঙ্গবন্ধু তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *