কড়ানজর
  • September 28, 2020
  • Last Update August 15, 2020 7:07 am
  • গাজীপুর

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কারবালা থেকে ৩২ নম্বর

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কারবালা থেকে ৩২ নম্বর

কড়া নজর প্রতিবেদন-
‘প্রভু! হোসেনের কথা, কারবালা প্রান্তরে একবিন্দু জলের কথা, হোসেনের ক্রোড়স্থিত শিশুসন্তানের কোমল বক্ষ ভেদ করিয়া লৌহতীর প্রবেশের কথা, মনে হইয়া হানিফার প্রাণ আকুল করিয়াছে’।
হিজরী ৬১ সনের ১০ মহররম কারবালা প্রান্তরের,শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা) এর দৌহিত্র ইমাম হোস্ইান সপরিবারে ৭২ জন অনুসারী নিয়ে বিশ্বাসঘাতক ক্ষমতালোভী ইয়াজিদের অনুচরদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হলেন। আহলে ব্যাইয়াতের (নিজ জাতির) হাতে নির্মমভাবে ইমাম হোসাইনের খুনরাঙ্গা ইতিহাসের স্রোতধারায় বঙ্গবন্ধুর আত্মদান কী নিষ্ঠুর মেল-বন্ধন, কী হৃদয়-বিদারক সাদৃশ্য!
(২)
তল্পিবহনকারী, দালাল, সুবিধাভোগী, দেশদ্রোহীচক্র যারা নানা ছদ্মাবরণে হায়দরাবাদের জাতীয় ঐক্য, সংহতি, সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতি ও নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংসের জন্য কাজ করছিল, তারা এবার প্রকাশ্যে এসে হাত মেলালো ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে। হায়দরাবাদের রাজনীতিবিদ, সমরনায়ক, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের বিরাট অংশ জাতীয় প্রতিরোধ সংগ্রামকে ভেতর থেকে ভয়ানক দুর্বল করে তুললেন। গোটা জাতিকে নানা কায়দায় পরিষ্কার দুটো ভাগে বিভক্ত করে তুলল। নানা কল্পকাহিনীর জন্ম দিল তারা। ভারতে ইংরেজদের আধিপত্য প্রতিরোধে টিপু সুলতান ১৮০০ শতাব্দীর শেষদিকে ইংরেজদের সঙ্গে তীব্র লড়াই করেছিলেন। কিন্তু তার এক সেনাপতি মীর সাদিক বিশ্বাসঘাতকতা করে বৃটিশদের সঙ্গে হাত মেলান ৷ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সঙ্গে যুদ্ধে ১৭৯৯ খৃস্টাব্দে তিনি পরাজিত ও সপরিবারে নিহত হন ৷অনেক খোঁজাখুঁজির পর যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রাসাদে যখন শের-ই-সুলতান টিপু’র মরদেহ পাওয়া গেল তখন এক গাদ্দার সৈনিক ওই মরদেহে ইংরেজদের হাত লাগাতে না দিয়ে নিজে সুলতানের শিরস্ত্রাণ চোখে লাগিয়ে বললো – “উনার হত্যাকারী আপনারা নন,আমরা। আমরা সুলতানকে হত্যা করেছি। আমাদের ভাবী বংশধররা উনার কবরে ফুল চড়াবে। ‘টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর সেরিংগাপটমের প্রতিটি ঘরে যখন ইংরেজদের নির্যাতনের নমুনা প্রকাশ শুরু হলো-তখন মীর সাদিক,পুর্নিয়া,কামরুদ্দীন,মইনুদ্দীনের মতো গাদ্দারাও বুঝতে পারলো-ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়ে তারা শুধু স্বজাতির স্বাধীনতা বিকিয়ে দেয়নি বরং তাদের স্ত্রী কন্যাদের ইজ্জতের সওদাও করে নিয়েছে; কিন্তু তখন আফসোস ছাড়া তাদের আর কিছুই করার ছিল না ।
(৩)
কাসিম বাজার কুটি ও নবাব প্রাসাদ থেকে পলাশীর রনাঙ্গন পর্যন্ত ষড়যন্ত্র প্রশস্থ হতে থাকে। গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্তদের অনেকেই নবাবের পরম আত্মীয়। অন্ততঃ নবাব বাহিনীর প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান ও ঘসেটি বেগমের নাম সর্বজনবিদিত। সঙ্গে নবাব মন্ত্রীসভার জগত শেট, উমি চাদ, রাজবল্লব, রায় দ‚র্লভ, রাজ নারায়ন প্রমুখরা। পলাশীর যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার ও ৮টা কামান এবং অপরদিকে নবাব সিরাজ বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার ও ৪০টা কামান। বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে প্রধান সিপাহসালার মীর জাফর যুদ্ধে অংশগ্রহন না করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকায় নবাবের পরাজয় নিশ্চিত হয়।
১৭৫৭ সালের ২রা জুলাই নবাব সিরাজকে সপরিবারে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে আনা হয়। দুপুর বেলা-অগণিত প্রজা সাধারণ তাদের প্রাণপ্রিয় নবাবকে একনজর দেখতে আসে। মীরজাফরের পাপিষ্ঠ পুত্র মীর মিরন জাফরগঞ্জ প্রাসাদে নবাব সিরাজকে বন্দি রাখে। এই জাফরগঞ্জ প্রাসাদকে এখন বলা হয় নিমকহারাম দেউড়ি। লর্ড ক্লাইভের পরামর্শে মীরজাফরের নির্দেশে বাংলার শেষ নবাব সিরাজ-উদ-দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ঘাতক যখন তাকে হত্যা করতে উদ্যত হয় ওজু করে দু’রাকাত নামাজ আদায়ের সুযোগদানের অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু এ অনুরোধ রক্ষা করেনি ইংরেজের সেবাদাস নবাবের বেতনভুক্ত কর্মচারী ঘাতক মোহাম্মদী বেগ। অবশেষে ৪ঠা জুলাই মিরণের আদেশে মোহাম্মদী বেগ নবাব সিরাজের দেহটি উপর্যুপরি তরবারির আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেলে। তারপর সেই ছিন্নভিন্ন দেহ পরদিন সকালে হাতির পিঠে চাপিয়ে বেরুলো আনন্দ মিছিলে। নেতা মিরণ, চললো রাজপথ পরিভ্রমণে। হাতি সিরাজের বাসভবন, হীরাঝিলের সামনে দাঁড়ালে সিরাজের মাতা আমিনা বেগম রাজপথে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসেন ,পুত্রহারা আমিনা বেগমের কান্নায় আকাশ-বাতাস শোকাহত ও ব্যথিত হয়ে ওঠে। তিনি হাতির পিঠ থেকে নবাবের লাশ নামিয়ে চুম্বন করতে লাগলেন। মায়ের আহাজারি দেখে শববাহী হাতিচালকের নির্দেশ অমান্য করে সহসা রাজপথে বসে পড়লো। কিন্তু মিরণের নির্দেশে বিশ্বাসঘাতক খাদিম কিল, ঘুষি মেরে নবাবের কন্যা, স্ত্রী ও মা আমিনাকে জোর করে অন্দরমহলে পাঠিয়ে দিলো। এরপর সিরাজের দলিতমথিত লাশ বাজারের আবর্জনার স্ত‚পের মধ্যে ফেলে দিয়ে চলে গেলো।
সারাদিন সিরাজের লাশ পড়ে থাকলো মুর্শিদাবাদের বাজারের সেই ময়লার স্ত‚পের উপর। ভয়ে কেউ এগিয়ে এলো না লাশ দাফনের জন্য। সন্ধ্যার অন্ধকারে ভাগীরথী যখন রূপার পাতের মত বয়ে যাচ্ছে, আতঙ্কিত মানুষ নিজ নিজ গৃহে খুঁজে বেড়াচ্ছে নিরাপত্তা, সে সময় মির্জা জৈন-উল-আবেদিন অত্যন্ত যত্ন সহকারে বুকে তুলে নিলেন সিরাজের ছিন্নভিন্ন মৃতদেহ। তারপর শ্রদ্ধার সাথে ধুয়ে মুছে নৌকায় তুলে, ভাগীরথী পাড়ি দিয়ে চললেন খোশবাগে।
১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুনের পলাশী প্রাঙ্গনে ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র ১৫ আগষ্ট ১৯৭৫ সালেও দৃশ্যমান। কাপুরুষ ইয়াজিদ ,মীর সাদিক , মীর জাফরের মতো খোন্দকার মোস্তাক ও জেনারেল জিয়ার আবির্ভাব।
(৪)
তিন লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহারা আর্ত চিৎকারে বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নিলো ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে রাঙ্গা বাংলাদেশ । হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ গড়ার দায়িত্ব হাতে নিয়ে স্বস্তিতে একটি দিনও অতিবাহিত করতে পারেন নি । স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটি মুহুর্ত পিতা মুজিব প্রতিকুলতার সাথে লড়াই করে চলছেন,তবু স্বাধীনতা বিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অপশক্তির সাথে আপস করেননি ।
১৪ আগস্ট ’৭৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় একাধিক শক্তিশালী বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এরূপ পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানস‚চি ঝুঁকিমুক্ত ও নিরাপদ করার জন্য ঢাকার অধিকাংশ গোয়েন্দা মাঠকর্মীকে ওই এলাকায় পাঠানো হয়। একইদিন দুপুরে একটি ভারতীয় হেলিকপ্টার, যেটি পার্বত্য চট্টগ্রামে অবস্থানরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাজে নিয়োজিত ছিল, সেটি ফেনী এলাকায় বিধ্বস্ত এবং এর সব যাত্রী ঘটনাস্থলে নিহত হয়। তাদের মৃতদেহ ঢাকায় নিয়ে আসা ও আনুষঙ্গিক কার্যাদি নিয়ে সেনাপ্রধান, সিজিএস, ৪৬ স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড কমান্ডার, ডিজিএফআই প্রধানসহ সেনাবাহিনীর নিজস্ব গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকেন। অতঃপর ক্লান্ত দেহে বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে যান তারা।
ধানমন্ডির ৩২’নম্বর বাড়িতে শিশুপুত্র রাসেলকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ঘুমাচ্ছিলেন দোতলায় শোবার ঘরে। শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামাল তিনতলায়, শেখ জামাল, তার স্ত্রী রোজি জামাল এবং বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের ঘুমিয়েছিলেন দোতলায়। বাড়ির নিচতলায় নিরাপত্তারক্ষী, কাজের ছেলেসহ সবাই ডিউটিতে ছিলেন।
৭৫-এর ১৪ আগস্ট, ঢাকা সেনানিবাসের মেজর ফারুকের ১ বেঙ্গল ল্যান্সার এবং তার নিকটাত্মীয় মেজর রশীদের ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি সেনাবাহিনীর স্থায়ী আদেশ অমান্য করে নিজ নিজ ইউনিটের নাইট ট্রেনিং শুরু করে রাত ৯ টার পর। সাধারণত অধিনায়কসহ সব অফিসারই ট্রেনিং গ্রাউন্ডে থাকার কথা থাকলেও এক অথবা দু’জন অফিসার ছাড়া ওই রাতে দুই ইউনিটেরই অধিকাংশ অফিসার তাদের অধিনায়কের অফিসে গোপন শলাপরামর্শে ব্যস্ত থাকে। তাদের মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি তাদের অফিসারের দায়িত্বে সীমিতসংখ্যক আর্টিলারির গোলাবারুদ গোপনে বের করলেও সৈনিকদের অস্ত্রের গোলাবারুদ দেয়া হয়নি। রাত ১টার সময় ট্রেনিং শেষ হলেও আধাঘণ্টার বিশ্রাম দিয়ে আবারও জমায়েত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ইতিপ‚র্বে উভয় ইউনিটের কেউ যেন অনুমতি ব্যতিত বাইরে যেতে বা প্রবেশ করতে না পারে তা নজরে রাখার জন্য অফিসারকে দায়িত্ব দেয়া হয়।
রাত ১ টা ৩০ মিনিটে আর্টিলারি ইউনিটের সৈনিকদের আবারও জড়ো করে সবাই উপস্থিত আছে কিনা নিশ্চিত করা হয়। এরপর যৌথভাবে ট্রেনিংয়ের নামে তাদের লড়িতে ওঠার নির্দেশ এবং ১ম বেঙ্গল ল্যান্সার ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। রাত ৩টার কিছু পর উভয় ইউনিটের সৈনিকদের একত্রিত করা হলে মেজর ফারুক, মেজর রশীদ, চাকরিচ্যুত মেজর ডালিম ও মেজর ন‚র যুদ্ধ পোশাকে সজ্জিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার এবং তার সরকার উৎখাতে শামিল হওয়ার আহŸান জানান। উপরোক্ত অফিসারদের বক্তব্য শেষে ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের পক্ষ থেকে সৈনিকদের মাঝে গোলাবারুদ বণ্টন করা হয়।
চাকরিরত ও চাকরিচ্যুত সব মিলিয়ে বারজন অফিসারকে বিভিন্ন টার্গেটের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়। মেজর ফারুক, মেজর রশীদ এবং মেজর ডালিম ভিন্ন ভিন্নভাবে টার্গেটগুলোর তত্ত¡াবধায়কের দায়িত্ব নেয়। রাত আনুমানিক ৪টার সময়ে বেশকিছু জিপ ও লরির একাধিক কনভয় সেনানিবাস থেকে বের হয়ে আসে। কিছুক্ষণ পর ট্যাংকও তাদের অনুসরণ করে। যাত্রার আগে এমনভাবে কনভয়ের অবস্থান নির্ণয় করা হয়েছিল, সব টার্গেটে যেন প্রায় একই সময়ে আঘাত হানা যায়। সেই মোতাবেক কনভয়ের প্রথম ভাগে মেজর ডালিমের নেতৃত্বে একটি জিপ ও এক ট্রাক সৈন্য মহাখালী-মগবাজার হয়ে দ্রæততম সময়ে মিন্টো রোডে মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের সরকারি বাসভবনে পৌঁছে এবং কর্তব্যরত দুর্বল পুলিশি প্রহরা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলে। মেজর রাশেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আরেকটি দল ফার্মগেট-হোটেল ইন্টারকন হয়ে একই টার্গেটে ২৯ মিন্টো রোডে উপস্থিত হয়ে সেরনিয়াবাতের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলির শব্দে বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে যায়। আবদুর রব সেরনিয়াবাত কালবিলম্ব না করে রাষ্ট্রপতিকে ফোন করেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ফোনালাপ শেষ হওয়ার আগেই মেজর রাশেদ চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মোস্তফা ও তাদের দল গুলি ছুড়তে ছুড়তে দরজা ভেঙে ঝড়ের বেগে দোতলায় উঠে যায়। মন্ত্রী ও তার পরিবার এবং ক’জন অতিথিকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নিয়ে আসে। এরপর লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে সাব-মেশিন কারবাইনের (এসএমসি) ট্রিগার চেপে ধরে। গুলির শব্দ এবং মানুষের চিৎকার ও আর্তনাদ যেন খোদার আরশ পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। চার বছরের শিশু সুকান্ত বাবুর মতো নিষ্পাপ শিশুও এই ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি।
মেজর আজিজ পাশা, রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের অপর গ্রুপ প্রায় একই সময় ধানমÐিতে যুবনেতা শেখ মনির বাসায় হানা দেয়। বিনা বাধায় বাড়ির দোতলায় উঠে এই গ্রুপটি শেখ মনি ও তার অন্তঃসত্ত¡া স্ত্রীকে গুলি করে হত্যার পর ভাবলেশহীনভাবে বেরিয়ে ৩২ নম্বর রোড ধানমÐির দিকে চলে যায়। খুনিরা সবাই মুসলিম এবং শান্তির ধর্ম ইসলামে বিশ্বাসী ছিল।
তৃতীয় দলটির টার্গেট ধানমÐির ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি, যেখানে সপরিবারে অবস্থান করছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা শেখ মুজিব। যেহেতু এই টার্গেটে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্য পাহারা রয়েছে তাই কিছুটা ঝুঁকিপ‚র্ণ। তাই ভিন্নভাবে ঘায়েল করতে হবে।
রাত্রি দ্বিপ্রহর থেকেই গুরিগুরি বৃষ্টি হচ্ছিল। পরিকল্পনানুযায়ী আর্টিলারির মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি অংশ লেকের অপর পাড়ে মর্টার ও ভারি মেশিনগান নিয়ে, মেজর মহিউদ্দিন ল্যান্সার গ্রুপ ৩২ নম্বর রোড ধানমÐির পশ্চিম প্রান্তে, মেজর ন‚র ও ক্যাপ্টেন বজলু ৩২ নম্বর রোডের প্রবেশমুখে মিরপুর রোডে অবস্থান গ্রহণ করে। আরেকটি দলকে রাখা হয়েছে ৩১ নম্বর রোডে যেন কেউ পেছন দিক দিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে। মেজর ফারুক ফার্মগেটে ট্যাংক নিয়ে ওয়্যারলেস সেটের মাধ্যমে তত্ত¡াবধান করছিল। বেশ কয়েকটি ট্যাংক রেডিওস্টেশন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও এর আশপাশে অবস্থান নিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরই বঙ্গবন্ধু তার ভগ্নিপতি আ. রব সেরনিয়াবাতের টেলিফোন পেয়ে বিচলিত হয়ে দোতলা থেকে তার পিএ মুহিতুল আলমকে দ্রæত পুলিশ কন্ট্রোলরুমে লাইন মেলাতে বলেন। মুহিতুল যখন লাইন লাগাতে ব্যস্ত, এমন সময়ে গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরিহিত বিচলিত বঙ্গবন্ধু দ্রæত পায়ে দোতলা থেকে নিচে নেমে আসেন। বঙ্গবন্ধু অধৈর্য হয়ে মুহিতুলের কাছ থেকে ফোন নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছেন। বাড়ির দক্ষিণের লেকের ওপার থেকে আর্টিলারির মেজর মহিউদ্দিনের দলের মেশিন গানের গুলি এসে আছড়ে পড়তে শুরু করে এই বাড়ির দেয়াল ও কাচের জানালায়। মর্টারের গোলার শব্দে পুরো বাড়ি কাঁপছিল। অল্প সময় এই ঝাঁকে ঝাঁকে গুলির পর কিছু সময়ের জন্য নিস্তব্ধতা।
সুবহে সাদিক হয়ে উঠছে প্রায়, মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসছে ‘আস সালাতু খাইরুম মিনান নাঊম’।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *