কড়ানজর
  • October 26, 2021
  • Last Update October 1, 2021 6:00 pm
  • গাজীপুর

আফগানদের পরিত্যক্ত হিসাবে ছুঁড়ে ফেলে রাতের আঁধারে মার্কিনিদের পলায়ন

কড়ানজর প্রতিবেদনঃ

৩০ বর্গমাইল জুড়ে বাগরাম বিমানঘাঁটি। সর্বশেষ র্নিমার্ণটির দৈর্ঘ্যও দুই মাইলেরও বেশি। যাতে বড় ধরণের কার্গো এবং বোমারু বিমান অবতরণ করতে সক্ষম। সেখানে পর্যায়ক্রমে সুইমিং পুল, সিনেমা, স্পা, বার্গার কিং, পিৎজা হাটের মতো ফাস্ট ফুডের আউটলেটও তৈরি করা হয়েছে। বাগরাম বিমানঘাঁটিতে একটা কারাগারও আছে এবং সেই কারাগারে, খবর অনুযায়ী, এখনও বন্দি রয়েছে পাঁচ হাজারের মত তালেবান সদস্য। যা কিউবার কুখ্যাত কারাগারের নামে সেটি আফগানিস্তানের গুয়ান্তানামো হিসেবে পরিচিতি পায়। জর্জ ডাবিøউ বুশ, বারাক ওবামা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প- সবাই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় বাগরাম পরিদর্শন করেছেন। আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটোবাহিনী গত ২০ বছর আফগানিস্তানে যে ঘাঁটি গেড়ে বসেছিল তাঁর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই বাগমার ঘাঁটি। আমেরিকান সৈন্যরা শুক্রবার ভোররাত তিনটার সময় অতি গোপনে ঘাঁটিটি ত্যাগ করে। আফগান সামরিক বাহিনী তা জানতে পারে এর কয়েক ঘন্টা পর । সৈন্য প্রত্যাহারের ডেট লাইনের অনেক আগে এবং অপরাধীর মত চলে যাওয়ায় বিস্মিত সারা দুনিয়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেও অভিমত, আফগানিস্তানকে একা এবং পরিত্যক্ত হিসেবে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে তালেবানদের সামনে। ওই ঘাঁটির নতুন কমান্ডার জেনারেল আসাদুল্লাহ কোহিস্তানি হতাশার সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন, আফগান কর্তৃপক্ষকে কিছু না জানিয়েই আমেরিকান সৈন্যরা আফগাস্তানের বাগরামে তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানঘাঁটি ছেড়ে চলে গেছে রাঁতের অন্ধকারে। তিনি আরো বলেছেন, মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সাথে সাথে আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ দ্রুততার সাথে গ্রহণ করছে তালেবান।
জেনারেল কোহিস্তানি সোমবার বলেন যে আফগান সরকারি বাহিনী ধারণা করছে তালেবান বাগরাম বিমানঘাঁটি দখলের জন্য হামলা চালাবে।
বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত সাংবাদিকদের জেনারেল কোহিস্তানি বলেন বিমানঘাঁটির নিকটবর্তী গ্রাম এলাকায় ‘তালেবানের তৎপরতার’ কিছু খবর তারা ইতোমধ্যেই পেয়েছেন।
‘আমেরিকানদের সাথে যদি আমাদের বাহিনীর তুলনা করেন, তাহলে বলব আমরা তাদের থেকে অনেক আলাদা’, বলেন জেনারেল কোহিস্তানি। ‘আমাদের সাধ্য অনুযায়ী আমরা দেশের সব মানুষকে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।’
শুক্রবার আমেরিকা ঘোষণা করে যে তারা বাগরাম খালি করে চলে গেছে, যা তারা করেছে পূর্ব-ঘোষিত চূড়ান্ত সময়সীমার আগেই। এ বছরের গোড়ার দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা করেছিলেন, আমেরিকা আফগানিস্তানে তার সামরিক মিশন শেষ করে ১১ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে।
সেনা ঘাঁটি থেকে গভীর রাতে সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানতে চাইলে আমেরিকান সামরিক মুখপাত্র কর্নেল সোনি লেগেট উল্লেখ করেন, মার্কিন বাহিনী তাদের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে আফগান নেতাদের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করেছেন।


আমেরিকানরা আফগানিস্তান ছেড়ে যখন চলে যাচ্ছে, তখন সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে তালেবান খুব দ্রুত দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যেই গ্রামাঞ্চলের বেশ কিছু জেলা এবং পার্শ্ববর্তী বড় আফগান শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ তারা গ্রহণ করেছে।
গভীর রাতে বাগরাম থেকে আমেরিকানদের চলে যাওয়ার পর সামরিক ঘাঁটিটির নিয়ন্ত্রণ এখন আফগান বাহিনীর হাতে ন্যস্ত হলেও তাদের কাছে সরঞ্জাম ও কারিগরি অভাব থাকছে। ফলে তালেবানকে ঘাঁটি দখল এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ও জোট বাহিনী মিলিয়ে যে সৈন্য সংখ্যা ছিল জেনারেল কোহিস্তানির অধীনস্থ ৩ হাজার সৈন্য সে তুলনায় নগণ্য।
আফগানিস্তানের উত্তরে তালেবানের সাথে যুদ্ধরত প্রায় ১ হাজার আফগান সৈন্য সীমান্ত পেরিয়ে সোমবার তাজিকিস্তানে পালিয়ে গেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তালেবানের অব্যাহত অগ্রযাত্রা ঠেকাতে আফগান বাহিনী কতটা সক্ষম – এ ঘটনা থেকে তা নিয়ে আশংকা তৈরি হয়েছে।


বাগরামের দখলের ইতিবৃত্ত
বাগরাম বিমানঘাঁটির হাতবদল আগেও ঘটেছে। বিমান ঘাঁটিটি ১৯৫০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরি করেছিল যা ১৯৮০ এর দশকে তাদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হয়। আফগানিস্তানে তাদের দখল মজবুত করেছিল এই ঘ্াঁটি। বিমানঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ ছিল মস্কো সমর্থিত আফগান সরকারের হাতে। এরপর এটির দখল নেয় একটি মুজাহেদিন প্রশাসন এবং ১৯৯০’র দশকের মাঝামাঝি তালেবান ক্ষমতায় এলে বিমানঘাঁটিটি তাদের নিয়ন্ত্রণে আসে। মুজাহেদিন প্রশাসন ও তালেবানদের এই ক্ষমতা দখলে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করে মার্কিন প্রশাসন। লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত আধিপত্য রোধ করা। মার্কিন-তালেবান ঘনিষ্টতা বেশিদিন থাকেনি। উগ্র মৌলবাদী তালেবানরা দেশে দেশে মৌলবাদ রপ্তানির চেষ্টা করলে মার্কিন নীতির পরিবর্তন আসে। আফগানিস্থানে শক্ত ঘাঁটি করা সৌদী বংশোদ্ভূত ওয়াদা বিন লাদেন মাকিৃনিদেও জন্য চরম হুমকি হিসাবে আবির্ভূত হন। এসব প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ২০০১ সালে আফগানিস্তানের দখল নিয়ে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।
এটিকে তারা বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে থাকা এক বিশাল সেনা ঘাঁটিতে রূপান্তর করে। এখান থেকেই মার্কিন বাহিনী গত বিশ বছর ধরে তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছে। ২০০৬ সালের জুন মাসে ঘাঁটিটিতে আত্মঘাতি হামলা হয়।


আফগানিস্তান ঃ বাগরাম বিমান ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশক
যুক্তরাষ্ট্র এবং নেটোর জন্য আফগানিস্তানের বাগরাম বিমান ঘাঁটি তালেবান ও আল-কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মূল রণক্ষেত্র ছিল প্রায় ২০ বছর ধরে। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ত¡াধীন যৌথ বাহিনী ঘাঁটিটিতে প্রবেশ করে। পরে এটি প্রায় ১০ হাজার সৈন্য রাখতে সক্ষম একটি বিশাল ঘাঁটিতে পরিণত হয়। এখন এই সৈন্যরা চলে যাচ্ছে কারণ প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ওয়াদা করেছেন যে ১১ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব সেনা আফগানিস্তান ছাড়বে। কিন্তু এভাবে পরাজিত সৈনিকদেও মত প্রস্থান !
বিশ^ রাজনীতি নিয়ে গবেষকরা বলছেন ‘দেশে গিয়ে আমেরিকান এবং তার মিত্র বাহিনী দূর থেকে দেখবে যে, যা গড়ে তুলতে তারা ২০ বছর ধরে যুদ্ধ করেছে – তা পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। যেসব আফগান নাগরিকের জন্য তারা লড়াই করেছিল তারা তাদের সবকিছু হারাচ্ছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *